জাতীয় নিরাপত্তায় মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়

কেবলমাত্র বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিক তৈরির সঙ্কীর্ণ পরিধি থেকে বের হয়ে এই মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়কে উচ্চতর সামুদ্রিক কৌশল (Maritime Strategy) প্রণয়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারকরণের চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য মাইলফলক। বর্তমান সময়ে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে, তা মোকাবেলায় বাংলাদেশ এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও কৌশলবিদদের সহায়তা নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS), সমুদ্রসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সমুদ্রে ‘নন-ট্র্যাডিশনাল সিকিউরিটি থ্রেট’ মোকাবেলায় এটি বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী থিংক-ট্যাংক (Think-Tank) হিসেবে কাজ করছে

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত সামুদ্রিক চোক-পয়েন্টগুলোর (Choke Point) সঙ্কট বিশ্বকে একটি নির্মম বাস্তবতা দেখিয়ে দিয়েছে : সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ (Sea Control) ও জ্ঞানভিত্তিক সক্ষমতা না থাকলে একটি রাষ্ট্র যেকোনো সময় পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক খেলায় অস্তিত্ব হারাতে পারে।

বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে জাতীয় নিরাপত্তা ও সুনীল অর্থনীতির (Blue Economy) সম্ভাবনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল উচ্চতর সামুদ্রিক কৌশল প্রণয়নকারী বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির আজকের এই গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানে পৌঁছার পথটি সহজ ছিল না। চট্টগ্রামের জুলদিয়া মেরিন একাডেমি ক্যাম্পাসে ২০১১ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর, একটি সঙ্কীর্ণ প্রশাসনিক চক্রান্ত ও আমলাতান্ত্রিক ‘ভুল ট্র্যাক’-এ আটকে পড়েছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

ভুল ট্র্যাকে যাত্রা : সঙ্কীর্ণ গণ্ডি ও আমলাতান্ত্রিক দখল

২০১১ সালের প্রথমার্ধের ঘটনা। চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমির তৎকালীন কমান্ড্যান্টের একক নকশায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল ‘শেখ মুজিব মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি’। সরকারি চাকরির প্রচলিত নীতি ভেঙে টানা ১৫ বছর পদে বহাল থাকা এই কর্মকর্তা তার রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি সাধারণ মার্চেন্ট শিপিং (বণিক জাহাজ) ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার আয়োজন করেছিলেন।

তার মূল লক্ষ্য ছিল, খসড়া আইনে এমন বিধান রাখা যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল নিয়ন্ত্রণ মেরিন একাডেমির হাতে থাকে এবং তিনি স্বয়ং এর ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে তৈরি করা সেই খসড়া আইনে না ছিল সামুদ্রিক নিরাপত্তার (Maritime Security) সুযোগ, না ছিল কোস্টগার্ড, নেভাল আর্কিটেকচার, ওশেনোগ্রাফি কিংবা জাতীয় ভূ-রাজনীতি অধ্যয়নের কোনো রূপরেখা। অথচ বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের দিয়ে জাহাজ চালানো সম্ভব হলেও, বঙ্গোপসাগরের গভীর ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও সামরিক কৌশল অনুধাবনের মতো বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন কখনোই সম্ভব নয়।

সভার টেবিল থেকে প্রথম কৌশলগত লড়াই

চট্টগ্রামের জুলদিয়ায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর, দ্রুত মেরিটাইম অ্যাক্ট চূড়ান্ত করে ওই কমান্ড্যান্টকে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য বানানোর মাধ্যমে নিজেদের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যে উদ্দেশ্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ছিল, তা পরে প্রকাশ পায়। মূলত তৎকালীন মেরিটাইম একাডেমির কমান্ড্যান্টের রাজনৈতিক প্রভাব ও শেখ হাসিনার সাথে সুনির্দিষ্ট যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে গৃহীত কিছু পদক্ষেপের ফলেই এই বিষয়টি সামনে আসে। ঘটনার মোড় ঘোরে ২০১১ সালের ৭ জুন, যখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসকে (বিইউপি) খসড়া আইন চূড়ান্ত করার জরুরি সভায় যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। দেশের প্রথম মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়টি যদি জাতীয় নিরাপত্তার আওতা থেকে ছিটকে যায়, সেই আশু বিপদ অনুধাবন করেই বিইউপির প্রতিনিধি হিসেবে সেই সভায় একক কৌশলগত লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিই।

১. সময় কেনার কৌশল : তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত বন্ধে অন্যান্য সংস্থাকে লিখিত মতামত দেয়ার সুযোগ সৃষ্টির অজুহাতে সভা মুলতবির প্রস্তাব দিই, যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

২. একাডেমিক মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক চর্চার কার্ড খেলা : প্রস্তাবিত খসড়ায় ভিসি ও প্রোভিসি পদ কেবল সমুদ্রগামী জাহাজে ক্যাপ্টেন বা চিফ মাস্টার মেরিনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। বুয়েটসহ অন্যান্য প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে আমি যুক্তি তুলি যে, বিশ্বজুড়ে মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদ খাঁটি শিক্ষাবিদদের (Academicians) জন্য সংরক্ষিত থাকে। উচ্চতর একাডেমিক ডিগ্রি ছাড়া কেবল পেশাগত ট্রেনিং দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চালালে সাধারণ মানুষ ভাববে ‘নৌকার মাঝিরা বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছে’! এই তর্কে সভার সবাই একযোগে সমর্থন দেয়।

৩. কৌশলগত ছদ্মবেশ : টেবিলের আলোচনায় আমার মূল লক্ষ্য ছিল বিইউপির মডেলে প্রশাসনিক সুশাসনের স্বার্থে সশস্ত্রবাহিনী (নৌবাহিনী) থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব আনার পথ সুগম করা। বিইউপির প্রতিনিধিত্ব করলেও মূল কৌশল ছিল নৌবাহিনীর প্রশাসনিক ও কৌশলগত স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

৪. কারিকুলাম সম্প্রসারণ : প্রচলিত আইনের দোহাই দিয়ে স্পষ্ট করি, সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হতে বাধ্য, শিপিং মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। একই সাথে কারিকুলামে ওশেনোগ্রাফি, মেরিটাইম ল, নেভাল আর্কিটেকচার, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের প্রতিনিধিত্ব অন্তর্ভুক্তির দাবি তুলি।

সভার একপর্যায়ে আমি তৎকালীন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীর সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলি, ‘জাহাজের Safety (নিরাপত্তা বিধান) এবং জাতির Maritime Security (কৌশলগত সামুদ্রিক নিরাপত্তা)-র মধ্যে পার্থক্য কী?’ তৎকালীন কমান্ড্যান্ট বা মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের কাছে এর কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর ছিল না। আমি যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলি যে, বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সমুদ্রের ওপর আধিপত্য বজায় রেখে পরাশক্তি হিসেবে টিকে আছে, ঠিক সেভাবেই মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় কেবল বাণিজ্যিক জাহাজের ‘Safety’ দেখার জায়গা নয়, বরং এটি জাতীয় ‘Security’ ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের বিশেষায়িত ক্ষেত্র। এই কৌশলগত অকাট্য যুক্তিতে মন্ত্রীসহ উপস্থিত বেসামরিক নীতি-নির্ধারকরা পুরোপুরি আশ্বস্ত ও নিরুত্তর হয়ে যান।

আমলাতান্ত্রিক অচলাবস্থা ও গোয়েন্দা-কৌশল
উপস্থাপিত অকাট্য যুক্তির মুখে আমলারা টিকতে না পারলেও, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নিয়মকানুন জটিল করে রাখায় এবং প্রভাবশালী কমান্ড্যান্টের প্রভাবে সচিবরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে ফাইল হস্তান্তরে প্রচণ্ড প্রতিরোধ ও অসহযোগিতা করছিলেন। এই বাধা দূর করতে মাসের পর মাস এককভাবে লড়াই করতে হয়েছিল। বিশেষ করে, ‘চূড়ান্ত মেরিটাইম অ্যাক্ট’ এর মতো স্পর্শকাতর ফাইল পরিবর্তনের ফলে পুরো প্রজেক্ট আটকে যাওয়ার ভয়ে সচিবরা চরম সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগছিলেন। এই অচলাবস্থা ভাঙতে নিজস্ব গোয়েন্দা ব্যাকগ্রাউন্ড ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটি ঐতিহাসিক মাস্টারপ্ল্যান নেয়া হয়। বিষয়টি সাধারণ সচিবালয় থেকে বের করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার (Cabinet) বৈঠকে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। পূর্ব-অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এমন এক সুনির্দিষ্ট তথ্য-বিন্যাস তৈরি করা হয়েছিল, যা স্পষ্ট করে তোলে, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে শিপিং মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একই সাথে কৌশলগত প্রস্তাব দেয়া হয় : ‘প্রধানমন্ত্রীর উন্মোচিত ভিত্তিপ্রস্তর ও প্রজেক্ট ফাইল অপরিবর্তিত থাকবে; কেবল প্রশাসনিক কাঠামো শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের অধীনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছাতার নিচে চলে আসবে।’ এই সুনিপুণ কৌশল চূড়ান্ত সফল হয় এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়টিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালনার ঐতিহাসিক অনুমোদন দেন।

বিইউপি মডেল ও চূড়ান্ত বিজয়
তিন বছরের দীর্ঘ ও কৌশলগত লড়াই শেষে মাস্টারপ্ল্যানের শেষ বলটি খেলার চূড়ান্ত মুহূর্তটি আসে ২০১৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। দিনটি ছিল অদ্ভুত কাকতালীয়, ঠিক দুই বছর আগে ২০১১ সালের একই দিনে প্রধানমন্ত্রী মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তৎকালীন নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের দায়িত্ব নেয়ার তখন মাত্র তিন সপ্তাহ পার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সাথে সেটিই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ। জাতীয় সংসদ ভবনে, যেখানে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটির চূড়ান্ত রূপ দেয়ার প্রয়োজন ছিল।

নৌপ্রধান ছিলেন মেধাবী, তবে স্বভাবজাতভাবে নম্র ও মৃদুভাষী। গত তিন বছরের জটিল আমলাতান্ত্রিক লড়াইয়ের পর প্রধানমন্ত্রীর সামনে তাৎক্ষণিক যুক্তির টেবিলে তিনি কাক্সিক্ষত ‘বাউন্ডারি’ হাঁকাতে পারবেন কি না, অর্থাৎ শেষ বলটি সফলভাবে খেলে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে উপাচার্যসহ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এক ধরনের সূক্ষ্ম চ্যালেঞ্জের মেঘ দানা বেঁধেছিল। তবে কাকতালীয়ভাবে শৈশব থেকেই আমরা একে অপরের সুপরিচিত ছিলাম। জাতীয় সংসদ ভবনে যাওয়ার সময় একই গাড়িতে পাশাপাশি বসে দ্রুততার সাথে পুরো বিষয়টি তাকে ব্রিফ করি এবং প্রধানমন্ত্রীর সামনে অকাট্য বাউন্ডারি হাঁকানোর জন্য লিখিত ১ পৃষ্ঠার মূল যুক্তিটি তৈরি করে দিই :

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ঠিক এই দিনে দুই বছর আগে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও সঠিক কাঠামোগত রূপরেখার অভাবে এতদিনেও কাজের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এর প্রশাসনিক দায়িত্ব যদি নৌবাহিনীর হাতে ন্যস্ত করা হয়, তবে বিইউপির (BUP) সফল মডেল অনুসরণ করে এটি জাতীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তার একটি ফ্ল্যাগশিপ ইউনিভার্সিটিতে পরিণত হবে। পাশাপাশি, সশস্ত্রবাহিনীর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সেনাবাহিনীর প্রাধান্য থাকলেও, এখানে নৌবাহিনীর একটি স্থায়ী প্রশাসনিক কর্তৃত্ব সুরক্ষিত হবে।’

ঠিক তা-ই ঘটেছিল; এই সুনিপুণ ব্রিফিংয়ের ওপর ভর করে নৌপ্রধান প্রধানমন্ত্রীর সামনে সেই কাক্সিক্ষত ‘বাউন্ডারি’ হাঁকাতে সক্ষম হন। তার জোরালো ও যৌক্তিক উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তাবটির মৌখিক সম্মতি দেন। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পর সচিবদের বাধা দেয়ার আর সুযোগ থাকেনি, ফলে তৎকালীন শিপিং সচিব ও কমান্ড্যান্টের একক দখলের স্বপ্ন চিরতরে ডুবে যায়। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পরদিনই নৌপ্রধান সরাসরি একটি আধা-সরকারি পত্রের মাধ্যমে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর এই সম্মতির কথা অবহিত করেন এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার পথ সুগম করেন।

জাতীয় নিরাপত্তা ও সুনীল অর্থনীতির নতুন ঢাল
অবশেষে ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে বিইউপির আদলে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক ও একাডেমিক কর্তৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে ন্যস্ত হয়।

কেবলমাত্র বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিক তৈরির সঙ্কীর্ণ পরিধি থেকে বের হয়ে এই মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়কে উচ্চতর সামুদ্রিক কৌশল (Maritime Strategy) প্রণয়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারকরণের চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য মাইলফলক। বর্তমান সময়ে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে, তা মোকাবেলায় বাংলাদেশ এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও কৌশলবিদদের সহায়তা নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS), সমুদ্রসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সমুদ্রে ‘নন-ট্র্যাডিশনাল সিকিউরিটি থ্রেট’ মোকাবেলায় এটি বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী থিংক-ট্যাংক (Think-Tank) হিসেবে কাজ করছে।

জাতীয় সম্পদ ও দক্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত
আজকের মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি সুনীল অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে বিকাশ লাভ করছে। এই খাতে সামরিক নেতৃত্বের যোগ্যতার বড় দৃষ্টান্ত মেরিটাইম জগতের ‘কিংবদন্তি’ রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব:) মো: খুরশেদ আলম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমুদ্রবিষয়ক ইউনিটে দীর্ঘ ১৫ বছর সততা ও নিখুঁত পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে তিনি ভারত ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশকে এক লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি সমুদ্র এলাকা নিশ্চিত করে দিয়েছেন। যদিও রাজনীতিবিদরা এই সমুদ্রজয়ের কৃতিত্ব দাবি করেন, কিন্তু তার প্রজ্ঞা ও কার্যকর পেশাদার জ্ঞান ছাড়া প্রতিবেশী দুই শক্তিশালী দেশের কবল থেকে এই সমুদ্রসীমা উদ্ধার করা সম্ভব হতো না; বিরোধটি আজও অমীমাংসিত থাকত এবং বাংলাদেশ সম্পদ আহরণের কোনো চুক্তিই করতে পারত না। বর্তমানে তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া নেতৃত্বও একই দূরদর্শিতা নিয়ে দেশের সামুদ্রিক স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন আশা করি।

যে প্রতিষ্ঠানটিকে আমলাতান্ত্রিক চক্রান্তের মাধ্যমে জুলদিয়া মেরিন একাডেমির সঙ্কীর্ণ পরিধিতে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল, বিইউপির মডেলে নৌবাহিনীর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এনে জাতীয় নিরাপত্তার উপযোগী করার এই রূপান্তরটি দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসের এক অনন্য অর্জন। ‘সুনীল অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা’, এই দুই মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় আজ বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার এক অকুতোভয় এবং অপরাজেয় বৌদ্ধিক প্রহরী।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি