নতুন মাত্রায় ঢাকা ও ওয়াশিংটন সম্পর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে শিগগিরই বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, বোয়িং বাংলাদেশকে হতাশ করবে না এবং তিনি বিষয়টি ভুলবেন না।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

  • ট্রাম্পের চিঠিতে তারেকের সাথে বৈঠকের বার্তা
  • বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তে উচ্ছ্বাস

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে শিগগিরই বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, বোয়িং বাংলাদেশকে হতাশ করবে না এবং তিনি বিষয়টি ভুলবেন না।

৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটের কথা উল্লেখ করে তার নেতৃত্বে দেশের ‘খুব উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ দেখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। চিঠিতে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উষ্ণ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসাও জানান তিনি। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি আসে বৈঠক প্রসঙ্গে- ট্রাম্প বলেন, ‘খুব বেশি দূরের ভবিষ্যতে’ তিনি তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছেন।

এ চিঠিকে কেবল সৌজন্যবার্তা হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে বোয়িং ক্রয়, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য কাঠামো, রোহিঙ্গা সঙ্কট, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব- সবকিছুকে একসাথে বিবেচনা করলে ট্রাম্পের বার্তাটি ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের একটি নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত দিতে পারে।

বোয়িং চুক্তি শুধু বিমান কেনা নয়

ট্রাম্পের চিঠিতে বোয়িংয়ের প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ‘বোয়িং তোমাকে হতাশ করবে না, এবং আমি ভুলব না’- এই বক্তব্যের মধ্যে বাণিজ্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বোয়িং কেনা নিছক রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার বহর সম্প্রসারণের বিষয় নয়। এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, মার্কিন পণ্য কেনা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ককে আরো ভারসাম্যপূর্ণ করার প্রশ্নও জড়িত। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অর্থনৈতিক নীতিতে বিদেশী অংশীদারদের কাছ থেকে মার্কিন পণ্য কেনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে।

ফলে বাংলাদেশের বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের কাছে একটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক সঙ্কেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত চিঠিতে বিষয়টির উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, সিদ্ধান্তটি তার নজরেও এসেছে।

শুল্কযুদ্ধ থেকে সমঝোতায় ঢাকা-ওয়াশিংটন

তারেক রহমানের সাথে ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি হলো দুই দেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্য সমঝোতা।

চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে সই করে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশী পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনে। একই সাথে নির্দিষ্ট কিছু বাংলাদেশী পণ্যকে শূন্য শতাংশ শুল্কসুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও অন্যান্য ইনপুট ব্যবহার করে নির্দিষ্ট পরিমাণ তৈরী পোশাকের জন্য শূন্য শুল্কের ব্যবস্থার কথা বলা হয়।

চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে এবং বিভিন্ন অশুল্ক বাধা কমাতে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, কৃষিপণ্য, আইসিটি পণ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমদানি-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ সহজ করার বিষয় রয়েছে।

অর্থাৎ, দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু তৈরী পোশাক রফতানি বা সাহায্যনির্ভর সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমেই ‘পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের’ কাঠামোয় প্রবেশ করছে।

তবে শুল্কের চাপ পুরোপুরি কাটেনি

এখানেই রয়েছে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের ওপর নতুন সেকশন ৩০১ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও টেক্সটাইল ইনপুট আমদানির সাথে সম্পর্কিত শুল্কমুক্ত কোটাব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।

ফলে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক উন্নত হলেও বাংলাদেশের রফতানিকারকদের সামনে শুল্ক ও বাজার-সুবিধার অনিশ্চয়তা পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিশেষ করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত তৈরী পোশাক। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে শুল্ক, কাঁচামাল, শ্রমমান, কমপ্লায়েন্স এবং উৎপাদন ব্যয়- সবকিছুতেই নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

এ অবস্থায় তারেক-ট্রাম্প বৈঠক হলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে মার্কিন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল শুল্কসুবিধা।

বাণিজ্যের বাইরে নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি

ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ একই সাথে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য তৈরি করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সাথে ঢাকার নতুন কৌশলগত যোগাযোগ ওয়াশিংটনের নজরের বাইরে থাকার কথা নয়।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের মূলনীতি হওয়া উচিত- কোনো একক শক্তির বলয়ে না গিয়ে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বহুমাত্রিক কূটনীতি।

রোহিঙ্গা সঙ্কটে নতুন সুযোগ

রোহিঙ্গা সঙ্কটও তারেক-ট্রাম্প সম্ভাব্য বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হতে পারে। বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে এই সঙ্কট বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর আরো বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

সুতরাং ওয়াশিংটনের কাছে বাংলাদেশের প্রত্যাশা শুধু ত্রাণসহায়তা নয়; মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ও ‘ব্যক্তিগত সম্পর্ক’ বনাম রাষ্ট্রীয় স্বার্থ

তারেক রহমান সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থের পাশাপাশি গণতন্ত্র, নির্বাচন, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয়ও গুরুত্ব পাবে।

ওয়াশিংটন সাধারণত অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারের প্রশ্নকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে ঢাকার জন্যও প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানো।

ট্রাম্পের চিঠিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা এবং ব্যক্তিগতভাবে বৈঠকের আগ্রহ নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হওয়া উচিত- এই ব্যক্তিগত উষ্ণতাকে কিভাবে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থে রূপান্তর করা যায়।

বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনকে একটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক বার্তা দিয়েছে। এখন এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে চাইতে হবে আরো স্থিতিশীল মার্কিন বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্বালানি সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সঙ্কটে কার্যকর মার্কিন ভূমিকা।

একই সাথে ঢাকাকে সতর্ক থাকতে হবে- যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠতা যেন ভারত বা চীনের সাথে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক শক্তি মূলত তার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানেই।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের চিঠি একটি সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলেছে। বোয়িং ক্রয় থেকে বাণিজ্য চুক্তি, শুল্কনীতি থেকে রোহিঙ্গা সঙ্কট, ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান- সবকিছু মিলিয়ে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলগত।

তারেক রহমান- ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠক তাই কেবল দুই নেতার সৌজন্য সাক্ষাৎ হবে না; এটি বাংলাদেশের পরবর্তী বৈদেশিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও হতে পারে।