মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে মৌলিক সওয়াল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, অস্তিত্বগত। সওয়ালটি হলো আমরা কে? এর জবাব নির্ধারণ করে মানুষ নিজেকে কীভাবে বুঝবে, সমাজকে কীভাবে সংগঠিত করবে এবং কোথায় কায়েম করবে নৈতিকতার বুনিয়াদ। মানুষের কর্ম, চিন্তা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার সমস্ত নির্মাণ শেষ পর্যন্ত তার আত্মপরিচয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই ‘আমরা কী করব?’-এই ব্যবহারিক প্রশ্নের চেয়ে জরুরি ও বুনিয়াদি সওয়াল হলো— আমরা কে?
সমকালীন মুসলিম সমাজের অধিকাংশ বিতর্ক শুরু হয় কর্মপদ্ধতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে। কিন্তু এসব বিতর্কের গভীরে যে অস্তিত্বগত সঙ্কট ক্রমাগত কাজ করছে, তা সাধারণত উপেক্ষা করা হয়। অথচ কর্মের পূর্বশর্ত হলো সত্তার উপলব্ধি। মানুষ যদি নিজের পরিচয় সম্পর্কে বিভ্রান্ত থাকে, তবে তার কর্মও অবধারিতভাবে গুমরাহির দিকে ধাবিত হবে। তাই বর্তমান সঙ্কটকে কেবল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক সঙ্কট হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। এটি মূলত ওজুদিয়তের সঙ্কট (Crisis of Being)। এটি মানুষের অস্তিত্ব-উপলব্ধির সঙ্কট।
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়লে রাষ্ট্র বিপর্যস্ত হয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধসে পড়লে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু মানুষের অস্তিত্ববোধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো সভ্যতার ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্র, শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, আইন কিংবা আখলাকসহ সভ্যতার তামাম মাত্রা ও প্রতিষ্ঠান মানুষের সত্তাবোধের বহিঃপ্রকাশ। যে সভ্যতা নিজের অস্তিত্বগত মরকজ (Ontological Centre) হারিয়ে ফেলে, সে ধীরে ধীরে তার আখলাকি মরকজও হারিয়ে ফেলে। আখলাক কোনো বিচ্ছিন্ন বিধিব্যবস্থা নয়। সে হচ্ছে মানুষের অস্তিত্ব-উপলব্ধির স্বাভাবিক ও অপরিহার্য সম্প্রসারণ। মানুষ নিজেকে যেমনভাবে বুঝে, তেমনিভাবে গড়ে ওঠে তার আখলাক, সিয়াসত ও তহজিব।
ইসলামী বিশ্বদৃষ্টিতে মানুষের পরিচয় কোনো সামাজিক চুক্তি, রাজনৈতিক সনদ কিংবা অর্থনৈতিক ভূমিকার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। মানুষের পয়লা পরিচয়— সে আল্লাহর বান্দা। দুসরা পরিচয়— সে দুনিয়ায় আল্লাহর খলিফা। এই দুই পরিচয় মানুষকে একই সাথে বিনয়, স্বাধীনতা, দায়িত্ব এবং জবাবদিহির এক সমন্বিত কাঠামোর কেন্দ্রে স্থাপন করে।
বান্দা হওয়া মানুষকে অহঙ্কার থেকে মুক্ত করে। খলিফা হওয়া তাকে নিষ্ক্রিয়তা থেকে উদ্ধার করে। ফলে ইসলামে মানুষ কেবল অধিকারভোগী নয়। সে আমানতের ধারক, নৈতিক দায়িত্বের বাহক এবং ইতিহাসের জবাবদিহিসম্পন্ন সত্তা।
এ কারণেই ইসলামে মানুষের পরিচয় রাষ্ট্র, জাতি, ভাষা কিংবা শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এসব পরিচয় বাস্তব জীবনের অংশ; কিন্তু এগুলো মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। মানুষের আসল পরিচয় একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বাস্তবতার সাথে যুক্ত। আল্লাহর সাথে তার সম্পর্কেই নিহিত তার অস্তিত্বের মরকজ। এখানেই গড়ে ওঠে ইসলামী অন্টোলজির মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু আধুনিকতার বিভিন্ন মতাদর্শ মানুষের এই মৌলিক পরিচয়কে বিকৃত করেছে। আধুনিক রাষ্ট্র মানুষকে নাগরিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। পুঁজিবাদ তাকে ভোক্তা হিসেবে দেখেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতি তাকে ভোটারে পরিণত করেছে। শিল্পসভ্যতা তাকে শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করেছে। ডিজিটাল যুগ তাকে তথ্য ও অ্যালগরিদমের উপাদানে পরিণত করেছে। এসব পরিচয় বাস্তবতার অংশ হলেও এগুলো মানুষের পূর্ণ পরিচয় নয়। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই আংশিক পরিচয়গুলো মানুষের মৌলিক পরিচয়ের জায়গা দখল করে।
এর ফলেই মানুষের ওজুদি এ’তেদাল বা অস্তিত্বগত ভারসাম্য ধ্বংস হতে থাকে। এর ফলে শিক্ষা আর হিকমত ও তাযকিয়ার অনুশীলন থাকে না। তা হয়ে উঠে কেবল শ্রমবাজারের প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা। অর্থনীতি ন্যায়, আমানত ও বরকতের বদলে হয়ে উঠে সীমাহীন উৎপাদন ও ভোগের আয়োজন। রাষ্ট্র নৈতিক সম্প্রদায়ের অভিভাবক না হয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সংস্কৃতি সত্য, সৌন্দর্য ও কল্যাণের অনুসন্ধান না করে বিনোদন ও বাজারের পণ্যে পরিণত হয়।
মানুষের সত্তা যখন সঙ্কুচিত হয়, তখন তার নির্মিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানও সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে।
এই সঙ্কটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— জ্ঞানগত অবক্ষয়। কারণ অস্তিত্ব সম্পর্কে বিভ্রান্তি জ্ঞান সম্পর্কেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। যখন মানুষ বাস্তবতার যথাযথ স্তরবিন্যাস ভুলে যায়, জীবনে এর প্রতিফলন অবধারিত হয়। আল্লাহ, ওহি, আকল, প্রকৃতি এবং মানবসমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক মানুষ ভুলে গেলে জ্ঞানও তার যথার্থ কেন্দ্র হারায়। তখন উপায় লক্ষ্যকে গ্রাস করে। প্রযুক্তি প্রজ্ঞার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। তথ্যকে জ্ঞানের সমার্থক মনে করা হয়। অথচ তথ্যের আধিক্য কখনো হিকমাহর একিন দেয় না। সঠিক অস্তিত্ববোধ ছাড়া তথ্য গুমরাহিকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
আধুনিক যুগে আত্মপরিচয়ের ধারণা এ কারণেই গভীর ভাঙনের কবলে পড়েছে। মানুষ নিজেকে আর কোনো অতীন্দ্রিয় নৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কল্পনা করে না; বরং সে নিজেকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড মনে করতে শুরু করেছে। ব্যক্তি-ইচ্ছা সত্যের মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতাকে দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হচ্ছে। ফলে স্বাধীনতা আত্মসংযমের পরিবর্তে সীমাহীন আত্মকেন্দ্রিকতার রূপ নিচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু দর্শনের পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে আছে পরিবার, শিক্ষা, রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য এবং আইনে; সমস্ত ক্ষেত্রে।
উত্তরণের পথ : অস্তিত্বের পুনরাবিষ্কার
তাহলে মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের সূচনা হবে কোথা থেকে? সেটি কেবল রাজনৈতিক সংস্কারে বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়, কেবল প্রযুক্তিগত ঔৎকর্ষেও নয়। এগুলো প্রয়োজনীয় অবশ্যই; কিন্তু যথেষ্ট নয়। কারণ যে সঙ্কটের শিকড় অস্তিত্বে, তার সমাধান কেবল কাঠামোগত সংস্কারে সম্ভব নয়। শিকড়ে অসুখ রেখে শাখা-প্রশাখা ছাঁটলে বৃক্ষ সুখী হয় না।
প্রকৃত পুনর্জাগরণের প্রথম শর্ত হলো অস্তিত্বগত পুনরাবিষ্কার বা Ontological Recovery। মানুষকে আবারো জানতে হবে— সে কে, কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে এবং কোথায় ফিরে যাবে। এসব সওয়ালের উত্তর ছাড়া কোনো সভ্যতা দীর্ঘস্থায়ী নৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে না। ইসলামের ভাষায় এটি কেবল জ্ঞানার্জনের বিষয় নয়। এ হচ্ছে মারিফাতুন নফস বা আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে রবের পরিচয়ে উপনীত হওয়ার সফর।
এই পুনরাবিষ্কারের কেন্দ্রবিন্দু হবে তাওহিদ। কারণ তাওহিদ হলো অস্তিত্বের সমন্বিত ব্যাখ্যা। তাওহিদ মানুষকে শেখায়— বাস্তবতার কেন্দ্র এক, সত্যের উৎস এক, নৈতিকতার ভিত্তি এক এবং মানুষের চূড়ান্ত আনুগত্যও এক। ফলে মানুষের জীবন বিচ্ছিন্ন খণ্ডে বিভক্ত থাকে না। ইবাদত, জ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবার ও সংস্কৃতিসহ জীবনের সব শাখা একটি ঐক্যবদ্ধ নৈতিক বিশ্বদৃষ্টির অধীনে অর্থ লাভ করে।
এরপর প্রয়োজন জ্ঞানব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস। এমন শিক্ষা, যা মানুষকে দক্ষ কর্মী বানাবে। একই সাথে নৈতিক ও প্রাজ্ঞ মানুষ হিসেবে সফল করবে। প্রয়োজন এমন অর্থনীতি, যা প্রতিযোগিতা নির্ভর নয়। এ অর্থনীতি বহন করবে আমানত, ন্যায় ও সামাজিক দায়িত্ব। প্রয়োজন এমন রাষ্ট্রচিন্তা, যেখানে ক্ষমতা হাসিল উদ্দেশ্য নয়। ক্ষমতা সেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠার উপায়। প্রয়োজন এমন সংস্কৃতি, যা মানুষের রুচিকে বাজারের হাতে সমর্পণ না করে সত্য, সৌন্দর্য ও কল্যাণের দিকে পরিচালিত করে। এসব পরিবর্তন কোনো এক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং মানুষের আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠনের পথ ধরেই এগুলো স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারে।
বস্তুত পুনর্জাগরণের পথ শুরু হয় ব্যক্তির হৃদয়ে। তার বিস্তার ঘটে জাহেরি জগতে। পরিবর্তনের টেকসই বিকাশের ধারা হলো ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠান থেকে সভ্যতার ধারাবাহিক রূপান্তর। কোনো মহান সভ্যতার উত্থানের সূত্রপাত বাহ্যিক শক্তি ও ক্ষেত্রে ঘটেনি, ঘটে না। আগে সেটি ঘটে অন্তর্গত দৃষ্টিভঙ্গিতে। সেখানে পরিবর্তনের মাধ্যমেই শুরু হয়েছে বৃহত্তর পরিবর্তনের মৌসুম।
অনেকেই ভাবেন মুসলিম সমাজের সামনে আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো— আমরা কী করব; না, তার আগের আরো বেশি জরুরি সওয়াল হলো— আমরা কে? কারণ কর্ম পরিচয়ের ফল, আর পরিচয়ই সভ্যতার উৎস। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে পারে, তখন তার কর্ম সঠিক পথে পরিচালিত হয়। যখন পরিচয় হারায়, তখন উন্নয়ন- অগ্রগতির রোডম্যাপও বিভ্রান্তির উপাদানে পরিণত হয়।
কাজেই মুসলিম পুনর্জাগরণের সূচনা হবে অস্তিত্বের পুনরাবিষ্কার থেকে। রাজনৈতিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কিংবা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ তখনই স্থায়ী কল্যাণ বয়ে আনবে, যখন সেগুলো এমন এক মানুষের হাতে থাকবে, যে জানে— সে আল্লাহর বান্দা, পৃথিবীতে তাঁর খলিফা এবং একদিন তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে।
মুসলিম উম্মাহের নানা অংশে হতাশা আছে। সওয়াল আছে যে, আমরা কিছু করছি না কেন? আমরা কী করব? কীভাবে করব? এ জাতীয় সওয়ালের উত্তর নির্ভর করে ‘আমরা কে’ নামক প্রশ্নের জবাবের ওপর। যে জাতি নিজের অস্তিত্বের সঠিক উত্তর খুঁজে পায়, সে পরের ধাপগুলোকে যথাযথভাবে পাড়ি দেয়ার দিশা লাভ করে। ইতিহাসে তার পুনর্জাগরণ অনিবার্য, অবধারিত।
লেখক : কবি, গবেষক



