আগামী ১ সেপ্টেম্বর ক্ষমতাসীন দল বিএনপি তাদের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছে। দলটির ঘোষিত পাঁচ দিনের কর্মসূচির সমাপনী দিনে অর্থাৎ ৫ সেপ্টেম্বর বেলা ৩টায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে একটি বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঠিক একই দিনে (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৭টায় ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে বিশাল লংমার্চের ডাক দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বিগত ফ্যাসিবাদের গণহত্যাকারীদের বিচার, ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম নিয়ন্ত্রণের ৬ দফা দাবিতে এই লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। একই দিনে দেশের দুই প্রধান শক্তির এই শোডাউনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে।
সূত্র মতে, গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, জ্বালানি সঙ্কট নিরসন, নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখাসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখতে চায় বিরোধীরা। তবে নৈরাজ্য ও সঙ্ঘাতের রাজনীতির পরিবর্তে রাজনৈতিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পালনের কথা জানিয়েছেন বিরোধীজোটের জ্যেষ্ঠ নেতারা। প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার অতীত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে রাজপথ ও সংসদে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক রাজনীতিতে আগ্রহী বিরোধীজোট। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, জনস্বার্থে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সহযোগিতার কথাও বলছেন তারা।
অন্য দিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান ও আগামীর অনিশ্চয়তা বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের জন্য এসিড টেস্ট বলে মন্তব্য করছেন। তাদের মতে, জুলাই বিপ্লবের ফসল হিসেবে ক্ষমতায় আসা এই সরকারের বিরুদ্ধে যখন জুলাই সনদের রায় বাস্তবায়নের দাবিতেই বিরোধী দল রাজপথে নামে, তখন নৈতিকভাবে সরকার কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে যায়। সরকারের ভেতর থেকে বলা হচ্ছে সময় প্রয়োজন, কিন্তু রাজপথ সেই সময় দিতে নারাজ। একদিকে জনগণের ঐতিহাসিক রায়ের প্রতিফলন ঘটানোর দায়, অন্যদিকে সরকারের ক্ষমতার স্থিতিশীলতা রক্ষা। সব মিলিয়ে দেশজুড়ে এখন একটাই আলোচনা, গণভোটের রায় কি শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে কার্যকর হবে, নাকি রাজপথের উত্তাপ নতুন কোনো অনিশ্চিত মোড় ঘুরিয়ে দেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের চাকা?
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছি। এখনও অবরোধ, হরতালের মতো কর্মসূচিতে যাইনি। জুলাই সনদ, গণভোট বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত কর্মসূচি দিচ্ছি। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আমরা থাকব। রাজনীতির বিতর্ক পার্লামেন্টেই থাকবে। নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি ও গঠনমূলক বিরোধিতার মধ্য দিয়েই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি জানান। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে একপ্রকার অচলাবস্থা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের লংমার্চ ইস্যু দেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ইতোমধ্যেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে চাপে রাখতে সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে ওয়াকআউট করেছে বিরোধীরা। সংসদে ওয়াকআউটের পাশাপাশি রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচির প্রস্তুতিও রয়েছে জোটটির। এটি শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর জন-আন্দোলনে রূপ নিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিরোধী জোটের সূত্রের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি এখনই বিল আকারে না আনার সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। ফলে, এই ২০টি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা থাকছে না। ফলে বিরোধী দলের আপত্তিতে সরকারি দলের কর্ণপাত না করা এবং গণভোটের রায় পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একাধিক উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে রাজপথে আন্দোলনের পথ তৈরি হচ্ছে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলন সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য আমাদের যা করা প্রয়োজন, আমরা তা করব। রাষ্ট্র সংস্কারে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন জরুরি, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতেই হবে। সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গণভোটের রায় মানতে চাচ্ছে না। আমরা মাঠে আছি। জনগণ দেশে পরিবর্তনের রাজনীতি দেখতে চেয়েছে। তারা আমাদের সাথে আছে।
এদিকে ৫ সেপ্টেম্বর ১১ দলের লংমার্চ এবং একই দিনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ আলোচনা সভা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন এক মেরুকরণ ও উত্তাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন অবসানের পর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা বিএনপির শক্তি প্রদর্শন, অন্যদিকে সমমনা ও ইসলামপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ১১ দলীয় জোটের রাজপথ কাঁপানোর ঘোষণা বর্তমান রাজনীতিকে এক জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
জানা গেছে, বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী মুক্ত পরিবেশে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংগঠনিক শক্তি জানান দিতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। বিশেষ করে ৫ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে ব্যাপক লোকসমাগমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে সারা দেশে সরব থাকবে। যদিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতারা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর দেশে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনভাবে কর্মসূচি পালন করতে পারছে, যা বিএনপির দীর্ঘ লড়াইয়েরই ফসল।
দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। যেকোনো দলের শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচিকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে ৫ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোনো অশুভ শক্তি যেন দেশে নতুন কোনো বিশৃঙ্খলা বা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা না করে, সেদিকে প্রশাসন ও জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, বিএনপি কখনোই শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি করে না।



