স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের তেরোটি নির্বাচন হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ এখন ‘অন সেশন’। কিছু নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে জনমনে কম-বেশি প্রশ্ন আছে। এ পর্যন্ত তিনটি দল জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ চারবার, বিএনপি তিনবার এবং জাতীয় পার্টি একবার। আমাদের এ আলোচনার প্রতিবাদ্য নিছক পরিসংখ্যান নিয়ে নয়; কোন দলের দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ার ‘আফটার অ্যাফেক্ট’ জাতির জন্য কেমন ছিল সেটিই আজকের আলোচ্য।
স্বাধীনতার পর, ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি দখলে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সে নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে লীগের কোনো প্রতিপক্ষ ছিল না। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ার দুঃসাহস কারো ছিল না। ১৯৭৩ সালের ওই নির্বাচনকে কেউই নির্বাচন বলেনি। বলেছে, হরিলুটের আসর। ১৯৭৩ সালের ‘নির্বাচিত সরকার’ জাতিকে প্রথম ‘উপহার’ দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। একই সাথে চলেছে লুটপাট এবং দখলবাজির এক কৃষ্ণকাল। ’৭৩ সালের ‘সেই’ প্রহসনের নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ ছিল মূলত এক দলের সংসদ। সেখানে সরকারের জবাবদিহির ন্যূনতম সুযোগ ছিল না। লীগ সরকার তাদের রচিত সংবিধান নিয়ে যথেচ্ছাচার করেছে। সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী পাস করিয়ে নেয় ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। একে কেবল সংশোধনী বলা হলে ভুল হবে। এর মাধ্যমে সংবিধানের মূল চেতনা ও চরিত্র পাল্টে দেয়া হয়েছিল। এ জন্য গণভোট অনুষ্ঠান ছিল অনিবার্য, অথচ সেটি হয়নি। মাত্র ১৪ মিনিটে সংবিধানের সেই সংশোধনী পাস করিয়ে নেয়া হয়। সংশোধনীর বিষাক্ত পরিবর্তনগুলো ছিল, সংসদীয় পদ্ধতি বাতিল করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতির প্রবর্তন। রাষ্ট্রপতিকে সীমাহীন ক্ষমতা দেয়া, যা স্বৈরতন্ত্রের পথ সুগম করে। তারই ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনার সরকার স্বৈরতন্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে একটিমাত্র রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) গঠন করা হয়। অন্য সব রাজনৈতিক দল বেআইনি ঘোষণা করা হয়। এভাবে একদলীয় শাসন কায়েম হয়। এই সংশোধনী জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। চতুর্থ সংশোধনীতে বিচার বিভাগের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সঙ্কুচিত করা হয়। রাষ্ট্রপতির হাতে বিচারক নিয়োগ, অপসারণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষমতা বাতিল করা হয়। সংবিধানে উল্লেখিত নাগরিকদের সর্বজনীন মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়। চারটি বাদে সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে প্রেস ফ্রিডমের ওপর সরাসরি আঘাত হানা হয়।
সংসদ ও স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা হ্রাস : জাতীয় সংসদের ক্ষমতা খর্ব করে এটিকে পুরোপুরি ক্ষমতাহীন এক ফোরামে পরিণত করা হয় এবং স্থানীয় সরকার কাঠামো ভেঙে দেয়া হয়। জাতীয় রক্ষী বাহিনী গঠন এবং বিরোধী মত দমনে বলপ্রয়োগের মতো বহু ঘটনা ঘটে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের আওতায় পড়ে। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতি দেশের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এটাই টু-থার্ড মেজোরিটির আফটার অ্যাফেক্ট।
১৯৭৭-১৯৮১ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপির দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের নির্বাচন ছিল অনেকটাই প্রশ্নমুক্ত। তাই দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ ছিল অনেকটা ‘ভার্সেটাইল’ পার্লামেন্ট। বহু মত ও পথের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিএনপি ওই সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ, ২০৭ আসন পেয়েছিল। ওই সংসদ বলতে গেলে দেশ ও জাতির জন্য ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। লীগ সরকার জাতিকে যে খাদের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল, জিয়াউর রহমান সেখান থেকে দেশ ও জাতিকে ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ফিরিয়ে এনেছেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে তার উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল, বাকশাল প্রথা বাতিল করে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।
মুক্তবাজার অর্থনীতি ও শিল্পায়ন : রুদ্ধদ্বার অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেন। তার সময়েই বহুল পরিচিত তৈরী পোশাকশিল্প ও জনশক্তি রফতানির মতো খাতগুলোর ভিত্তি স্থাপিত হয়, যা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের অন্যতম নায়ক জিয়া খাল খনন কর্মসূচি চালু করেন এবং সেচব্যবস্থার প্রসারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। স্বেচ্ছাশ্রমে তার নেতৃত্বে কয়েক হাজার খাল খনন করা হয়, যা কৃষি উন্নয়নে বিপ্লব এনেছিল। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা প্রতিষ্ঠার মূল রূপকার হিসেবে ভূমিকা পালন করেন জিয়াউর রহমান। সংবিধানের প্রস্তাবনায় সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের কথা সংযোজন করেন। গণমাধ্যমের ওপর থেকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তার আমলে যতগুলো জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, সবই প্রশ্নমুক্ত ছিল। শহীদ জিয়ার আমলে গঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ সার্বিক বিচারে এখন পর্যন্ত ‘এভার বেস্ট’ পার্লামেন্ট হিসাবে স্বীকৃত। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের বিএনপি পাওয়া দুই-তৃতীয়াংশের ইতিবাচকতা।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মোট তিনবার (দফা) সরকার গঠন করেছিল। স্মরণ করা যেতে পারে, তদানীন্তন বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হসিনা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বেগম জিয়াকে এক দিনের জন্যও কাজ করতে দেয়া হবে না। বাট কারভ্যান মুভ করেছে। খালেদা জিয়ার সরকারগুলোর গঠনের মেয়াদকালগুলো হলো : প্রথম মেয়াদ : ১৯৯১-১৯৯৬ (পঞ্চম জাতীয় সংসদ), দ্বিতীয় মেয়াদ : ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ)- এটি অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি একটি সংসদ। তৃতীয় মেয়াদ : ২০০১-২০০৬ (অষ্টম জাতীয় সংসদ)।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে বা জোটগতভাবে অষ্টম সংসদে স্পষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করেছিল। এই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার-দলীয় ঐক্যজোট সংসদের ৩০০টি আসনের ২১৪টি আসন লাভ করে। যা দুই-তৃতীয়াংশের (২০০টি আসন) বেশি ছিল। (এর মধ্যে বিএনপি এককভাবে পেয়েছিল ১৯৩টি আসন)। উল্লেখ্য : ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় সব বিরোধী দল বর্জন করায় বিএনপি এককভাবে ২৭৮টি আসন পায়। তবে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে সেই সংসদ মাত্র ১২ দিন স্থায়ী হয় এবং দ্রুত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করে ভেঙে দেয়া হয়। এই সংসদেই সংবিধানের ঐতিহাসিক দ্বাদশ সংশোধনী গৃহীত হয়। দেশে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়।
বেগম জিয়া সরকারের অবদানগুলো হচ্ছে : তিন মেয়াদের শাসনামলে শিক্ষা, অর্থনীতি এবং অবকাঠামো খাতে বেশ কিছু যুগান্তকারী ও দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখে। প্রধান অবদান হচ্ছে, নারী শিক্ষার প্রসার : গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়াতে দ্বাদশ শ্রেণী, কোনো মেয়াদে দশম শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক বা বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ চালু করা। মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখতে ঐতিহাসিক উপবৃত্তি প্রকল্প চালু করা হয়। এ ছাড়া দরিদ্র পরিবারের শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় উৎসাহিত করতে ১৯৯৩ সালে শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও সম্পূর্ণ ফ্রি করা হয়। এর ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার রেকর্ড ৯৭ শতাংশে পৌঁছায়। সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন : ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাস করা হয়। এর মাধ্যমে দেশে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা হয়। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়। কঠোর আইন প্রণয়ন, এসিড সন্ত্রাস ও নারী নির্যাতন রোধে তার সরকার ‘এসিড অপরাধ দমন আইন’ ২০০২ পাসের মাধ্যমে অপরাধীদের জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে কঠোর আইনি সংস্কার করে। যোগাযোগ খাত : বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো যমুনা বহুমুখী সেতুর মূল নির্মাণকাজ ১৯৯৪ সালে তার সরকারের আমলেই আনুষ্ঠনিকভাবে শুরু হয়। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে মেঘনা-গোমতী সেতু নির্মাণ করা হয়। যোগাযোগের আধুনিকায়ন : তার তৃতীয় মেয়াদে ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী ট্রেন চলাচলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যমুনা সেতুর ওপর দিয়ে সরাসরি রেল সংযোগ চালু করা হয়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাত : টাকার রূপান্তরযোগ্যতা : বাংলাদেশের স্থানীয় মুদ্রাকে (টাকা) প্রথমবারের মতো আংশিক রূপান্তরযোগ্য করা হয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি আসে। হাঁস-মুরগি ও ডেইরি খামার : যুবসমাজ ও গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করতে গবাদিপশু ও পোলট্রি খাতে ব্যাপক সরকারি অনুদান দেয়া হয়, যা দেশে বেসরকারি ডেইরি ও পোলিট্রি বিপ্লবের সূচনা করে। এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ জাতির জন্য সুদূরপ্রসারী কল্যাণ বয়ে আনে।
শেখ হাসিনার প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) আর্থিক খাতে নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা, ভয়াবহ দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এক শ্বেতপত্র কমিটির তথ্যমতে, এ সময় প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে এবং মোট পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ২৩৪ বিলিয়ন ডলার।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দেশ থেকে অর্থপাচার এবং ঋণখেলাপি সংক্রান্ত ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা এবং অর্থপাচারের পরিমাণ : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসিনার শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার করা হয়, যার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই সরানো হয় ১৭ বিলিয়ন ডলার। পাচারের মাধ্যম : মূলধনের অতিরিক্ত ও কম মূল্যে পণ্য আমদানি-রফতানি হুন্ডি পদ্ধতির মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে। পাচারকৃত অর্থ মূলত যুক্তরাজ্য, কানাডা, দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং বিভিন্ন ট্যাক্স হ্যাভেনে স্থানান্তরিত হয়েছে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে বিদেশে, বিশেষ করে লন্ডনে বিপুল সম্পত্তির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকারের পতনের পর দেখা যায়, এই পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে এক লাখ ৮২ হাজার কোটি থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়েছে (যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ২৭ শতাংশেরও বেশি)।
ব্যাংক দখল ও লুটপাট : সরকারের রাজনৈতিক মদদে ও পৃষ্ঠপোষকতায় বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ এবং বেক্সিমকোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নামে-বেনামে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন টাকা সরিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। পুরো ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক ব্যাংকের মালিকানা হাতবদল করা হয় এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে শূন্য করে দেয়া হয়। এ সময় খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র গোপন রাখতে ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ এবং নিয়ম শিথিল করার কৌশল নেয়া হতো, যার ফলে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৫টি ব্যাংকেই মোট খেলাপি ঋণের ৮৫ শতাংশ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছিল। হাসিনা সরকারের শাসনামলে ২০১০-১১ এবং পরবর্তী সময়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের কারসাজি হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হলেও এর সাথে জড়িত রাঘব বোয়ালদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
মেগা প্রকল্পে দুর্নীতি ও স্বজনপোষণ : বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের নামে অতিমূল্যায়ন, অডিট না করা এবং অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণের সীমা বৃদ্ধি, নিয়মকানুন শিথিল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার কারণে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যকারিতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। এই দীর্ঘ শাসনামলে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ভয়াবহ সঙ্কটে পড়ে।
শেখ হসিনার আমলে তথাকথিত তিনটি ‘সংসদ নির্বাচনে’ লীগ তিন দফা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করে। লীগ সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হওয়ার ‘কারিশমা’ ছিল এমন, যা ভোটারবিহীন ভোট, নৈশভোট এবং আমি-ডামির ভোট হিসেবে কুখ্যাতি পেয়েছে ।
তথাকথিত জাতীয় সংসদ জবাবদিহির কোনো শৈলীই অনুসরণ করেনি। এসব কারণে, বাংলাদেশ একটি ‘ফেইল্ড স্টেটের’ দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এককভাবে জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়েছিল। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ তথাকথিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু ১৯৮৮ সালের এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত একটি নির্বাচন ছিল। আওয়ামী লীগ এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-সহ দেশের প্রধান প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচন বর্জন করে। জেন: এরশাদের জাতীয় পার্টি এই জাতীয় পরিষদের ২৫১টি আসন পেয়েছিল। অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশের অনেক বেশি। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন থাকার কারণে এরশাদ সরকারের জন্য সংবিধান সংশোধন করা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। এই সংসদের সবচেয়ে ফলাফল ছিল সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বিল পাস করা।
১৯৮৮ সালের জুন মাসে এই সংসদের মাধ্যমেই সংবিধানে ২ (ক) অনুচ্ছেদ যোগ করে ‘ইসলাম’কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও এই চতুর্থ সংসদের মেয়াদ বেশি দিন টেকেনি। প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন না থাকায় এই সংসদের কোনো নৈতিক ভিত্তি ছিল না। মাত্র দুই বছর সাত মাস পরেই তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হন। একই সাথে এই সংসদের বিলুপ্তি ঘটে।
ত্রয়োদশ সংসদের অভিযাত্রা মাত্র শুরু হয়েছে। তবে এই সংসদের নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও তা নিয়ে কোনো মহলই উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠেনি। এই সংসদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এবারো জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সংসদের দুই- তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়েছে। যে দল ও ব্যক্তির ওপর মানুষের আস্থা বেশি হয়, তার কাছে থেকে জনগণের চাহিদাও কিছু বাড়তি থাকে। এটা এ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। নতুন সরকারের ভেতর থেকে পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা জনমনে কিছু ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে বটে, তবে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, সরকারকে নানা কিছু ম্যানেজ করে চলতে হচ্ছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। তারপরও সবমিলিয়ে বলা চলে, সরকারের একটা গুড বিগিনিং স্পষ্ট। মালয়েশিয়া ও চীন সফরে, তিস্তা ব্যারাজ, সীমান্তে জওয়ান ও জনতার কঠিন বুলন্দ আওয়াজ উপস্থিতি, ইরানি নেতার জানাজায় উপস্থিতি, সরকারপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে স্পষ্ট বক্তব্য, সশস্ত্র বাহিনীর পদবঞ্চিতের প্রতি ন্যায্যতা, বিদেশে নতুন বন্ধু নির্বাচন। এসব ‘গুড বিগিনিং’-এর একটি পথনকশা তৈরি করতে হবে এটাও ঠিক। যার শেষ ভালো তার সব ভালো।
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



