প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিগত ৭ মার্চ ২০২৬ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দেশের সম্মানিত আলেম-ওলামা, মাশায়েখ ও এতিমদের সম্মানে ইফতার অনুষ্ঠানে দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাত ব্যবস্থাপনা আরো কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করার পরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘লক্ষ্যভিত্তিক এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে জাকাত দেয়া হলে ১০-১৫ বছরের মধ্যে জাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশে দারিদ্র্যবিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। জাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করার লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা, ইসলামিক স্কলার এবং সরকারি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিদ্যমান ‘জাকাত বোর্ড’ পুনর্গঠন সম্ভব। জাকাতকে দারিদ্র্যবিমোচনে ব্যবহার করে ইসলামী বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি মডেল হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে বলেও আমি মনে করি।’
প্রধানমন্ত্রীর উল্লিøখিত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১২ মার্চ, ২০২৬ জাকাতব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, সংগ্রহ ও বিতরণপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং জাকাত বোর্ডকে অধিকতর কার্যকর ও শক্তিশালীকরণে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রীকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে আছে- ১. বিদ্যমান জাকাত ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, হালনাগাদের বিষয়ে সুপারিশ প্রদান; ২. জাকাত বোর্ডকে একটি স্বাধীন, কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রস্তাব প্রদান; ৩. জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে মোবাইল অ্যাপ প্ল্যাটফর্ম চালুর সম্ভাবনা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন; ৪. সাধারণ জনগণের মধ্যে জাকাত প্রদানের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জাকাতব্যবস্থার সুফল প্রচারে উপযুক্ত কৌশল ও কর্মপন্থা নির্ধারণ; এবং ৫. জাকাত ব্যবস্থাপনার সাথে সরকারের কর কাঠামোর সম্ভাব্য সমন্বয় সাধনে পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রদান। সার্বিক বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে।
জাকাত ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩ পর্যালোচনা
প্রথমত, জাকাত ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩-এর ৪ নং ধারায় জাকাত বোর্ড গঠন কাঠামোতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ছিল; কিন্তু তা করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক প্রত্যেক সচ্ছল ও বিত্তবান ব্যক্তির (নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক) ওপর জাকাত দেয়া ফরজ। এ লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে জাকাত সংগ্রহের বিধান রাসূল সা:-এর যুগ থেকে চলে আসছে। তৃতীয়ত, জাকাত ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩-এ ‘সরকারি জাকাত ফান্ডে’ দেশের সব মুসলিম নাগরিকের জাকাত দেয়া বাধ্যতামূলক নাকি স্বেচ্ছামূলক তার কোনো উল্লেখ নেই। চতুর্থত, জাকাত ব্যবস্থাপনা যেহেতু একটি ধর্মীয় কর্তব্য, সেহেতু এর সব কার্যক্রম শরিয়াহসম্মতভাবে সম্পাদন করা হচ্ছে কি-না তা পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ দিতে একটি ‘শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড’ গঠন করা অতি জরুরি হওয়া সত্ত্বেও জাকাত ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩-এ তার উল্লেখ নেই। পঞ্চমত, বিদ্যমান আইনের ১৩ নং ধারায় সরকারি জাকাত তহবিল তথা জাকাত বোর্ডের ব্যয়ের হিসাব মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃক নিরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবে জাকাত যেহেতু একটি ধর্মীয় তহবিল এবং তা ব্যয়ের নির্দেশনা আল কুরআনে সরাসরি দেয়া হয়েছে, সেহেতু কনভেনশনাল অডিটের পাশাপাশি তা উপযুক্ত শরিয়াহ অডিটর কর্তৃক নিরীক্ষার বিধান বিদ্যমান আইনে নেই। ষষ্ঠত, বাংলাদেশে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন বেসরকারি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ করা হচ্ছে। সন্দেহ নেই, এর মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ দুস্থ, এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত উপকৃত হচ্ছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের জাকাত ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে কোনো প্রকার জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা পরিলক্ষিত হয় না। এসব প্রতিষ্ঠানের জাকাত ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের কোনো বিধান বিদ্যমান আইনে রাখা হয়নি।
নিম্নলিখিত সুপারিশের আলোকে জাকাত ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩-এর প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন করা যেতে পারে :
ক. জাকাত বোর্ড গঠন কাঠামোতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আইসিটি মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
খ. ‘সরকারি জাকাত ফান্ডে’ দেশের সব মুসলিম নাগরিক কর্তৃক জাকাত দেয়া বাধ্যতামূলক নাকি স্বেচ্ছামূলক হবে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। বাধ্যতামূলক না হলে স্বেচ্ছায় জাকাতদাতারা সরকারি জাকাত তহবিলে জাকাত দেয়ার ব্যাপারে কতটুকু আগ্রহী হবে তা নিয়ে সংশয় আছে।
গ. জাকাত বোর্ড ও সরকারি জাকাত ফান্ডের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিশিষ্ট ওলামা ও ইসলামিক স্কলারদের নিয়ে একটি জাকাত সুপারভাইজরি বোর্ড গঠনের বিধান সংযুক্ত করা যেতে পারে।
ঘ. সরকারি জাকাত তহবিল সংগ্রহ ও বিতরণ এবং জাকাত বোর্ডের সার্বিক কার্যক্রম অডিট করতে কনভেনশনাল অডিটের পাশাপাশি উপযুক্ত শরিয়াহ অডিটর কর্তৃক নিরীক্ষার বিধান প্রণয়ন করা যেতে পারে।
ঙ. বিভিন্ন বেসরকারি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণকার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার বিধান প্রণয়ন করা যেতে পারে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ) মতো ‘জাকাত ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ (জেডএমএ) নামে একটি আলাদা সংস্থা গঠন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে এ জন্য একটি আলাদা আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।
চ. ‘জাকাত ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ বিভিন্ন বেসরকারি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে লাইসেন্স প্রদান ও সুপারভিশন করবে। এ বিষয়ে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া অনেক সাফল্য অর্জন করেছে; তাই সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে।
জাকাত বোর্ডের কার্যক্রম পর্যালোচনা
প্রথমত, সরকারি জাকাত বোর্ডের মাধ্যমে যে পরিমাণ জাকাত সংগ্রহ করা সম্ভব হয় তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য নয়। প্রতিষ্ঠানটির জাকাত সংগ্রহকার্যক্রমে সরকারি মাঠপ্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পৃক্ত থাকা সত্ত্বে¡ও সংগৃহীত জাকাতের পরিমাণ খুব কম। ধারণা করা হয়, সরকারি জাকাত ফান্ডের প্রতি জনগণের আস্থার সঙ্কট আছে। সরকারি জাকাত তহবিল বিতরণে যে স্বচ্ছতা থাকা দরকার এবং শরিয়াহ বোর্ডের অনুমোদন দরকার তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বিগত বছরগুলোতে জাকাত তহবিল কিভাবে বিতরণ করা হয়েছে সে সম্পর্কে জনগণের কাছে কোনো তথ্য নেই। সুতরাং বর্তমান ব্যবস্থায় জাকাত বিতরণের কোনো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি। জন-আস্থা অর্জন করতে হলে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে জাকাত বিতরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান আইনে জাকাতদাতাদের চিহ্নিত করা, ডাটাবেজ তৈরি করা এবং তাদের কাছ থেকে কিভাবে জাকাত আদায় করা হবে এবং এর সাথে সরকারি কর সংগ্রহের সমন্বয় কিভাবে হবে, তার কোনো উল্লেখ নেই। তৃতীয়ত, প্রচলিত ব্যবস্থায় সরকারি রাজস্বের যেসব উৎস আছে তার মধ্যে জাকাত ও অন্যান্য ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন (সাদাকা, ওয়াক্ফ, ক্যাশ ওয়াক্ফ, কর্জে হাসানা) তহবিলকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। বিশেষ করে সরকারের রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা কোথাও জাকাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তৃতীয়ত, জাকাত ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩-এর ৩ ও ৪ নং ধারায় জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণে বিধি বা প্রবিধি প্রণয়নে বোর্ডকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে; কিন্তু এ পর্যন্ত এরূপ কোনো বিধি বা প্রবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে কি-না তা জানা যায়নি। চতুর্থত, জাকাত ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের সাথে জড়িত কর্মচারীরা শরিয়াহর পরিভাষায় ‘আমিল’ নামে অভিহিত। সুতরাং তাদের নিয়োগের যোগ্যতা, নিয়োগপ্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ, কাজের পরিধি, জবাবদিহি ইত্যাদি বিষয়গুলো শরিয়াহসম্মত হতে হবে; কিন্তু এ সম্পর্কে বিদ্যমান আইনে কিছু বলা হয়নি। পঞ্চমত, দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাত একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প প্রণয়ন, সুপারভিশন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নপদ্ধতি তৈরি করা। বিদ্যমান জাকাত বোর্ডের এরূপ কোনো ব্যবস্থা আছে বলে মনে হয় না। শুধু সেলাই মেশিন বা রিকশা-ভ্যান বিতরণ যথেষ্ট নয়। অভাবী মানুষের সব চাহিদা পূরণ তথা তাদের স্বাবলম্বী করতে সমন্বিত কর্মসূচি বা প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন।
নিম্নলিখিত সুপারিশের আলোকে সরকারি জাকাত বোর্ড সংস্কার করা যেতে পারে :
ক. সরকারি জাকাত ফান্ডে জাকাত সংগ্রহে জাকাতদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা আনতে জাকাত তহবিল ব্যবহারে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
খ. সম্ভাব্য জাকাত দাতাদের চিহ্নিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বরের (টিআইএন) সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। তার ভিত্তিতে একটি ডাটাবেজ তৈরি হতে পারে। প্রথম পর্যায়ে সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের এর আওতায় আনা যেতে পারে।
গ. সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরকারি রাজস্বের যেসব উৎস আছে তার মধ্যে জাকাত ও অন্যান্য ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন (সাদাকা, ওয়াক্ফ, ক্যাশ ওয়াক্ফ, কর্জে হাসানা) তহবিলকে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিশেষ করে সরকারের রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ইসলামী সামাজিক অর্থায়নকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ঘ. জাকাত ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩-এর ৩ ও ৪ নং ধারায় জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণে বিধি বা প্রবিধি প্রণয়নে বোর্ডকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা কাজে লাগিয়ে সরকারি জাকাত ব্যবস্থাপনা কার্যকর ও গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় বিধি বা প্রবিধি প্রণয়ন করতে হবে।
ঙ. সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ে জাকাত সংগ্রহে আলাদা কর্মচারী নিয়োগ না করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপযুক্ত কর্মকর্তাদের ‘আমিল’ হিসেবে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের জাকাতের শরিয়াহ বিধি-বিধান ও জাকাত ক্যালকুলেশন সম্পর্কে নিবিড় প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
চ. দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাতকে একটি কার্যকর টুল বা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করতে হলে সুপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প প্রণয়ন, সুপারভিশন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নপদ্ধতি তৈরি করতে হবে। অভাবী মানুষের সব চাহিদা পূরণে সমন্বিত কর্মসূচি বা প্রকল্প নিতে হবে। দারিদ্র্যবিমোচনে যেসব জাকাত ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান সাফল্য অর্জন করেছে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
ছ. জাকাত বোর্ড জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর সহায়তায় দেশে জাকাত, ওয়াক্ফ ও উশরের সম্ভাবনা যাচাইয়ে একটি সমীক্ষা বা শুমারি পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। ফলে সংগ্রহ ও বিতরণ পরিকল্পনা সম্পর্কে একটি বাস্তব কর্মকৌশল প্রণয়ন করা সহজ হবে।
জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করা
বিদ্যমান জাকাত আইন বা জাকাত বোর্ডের জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণকার্যক্রমে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের অপ্রতুলতা আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে জাকাত সংগ্রহে মোবাইল অ্যাপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। আবার জাকাত বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল সিস্টেম বর্তমানে নেই। দ্বিতীয়ত, জাকাত বোর্ডের নিজস্ব ওয়েবসাইট নেই।
নিম্নলিখিত সুপারিশের আলোকে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণব্যবস্থা প্রযুক্তিনির্ভর করা যেতে পারে :
ক. সরকারি জাকাত তহবিল ও জাকাত বোর্ড সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করতে যথাশিগগির জাকাত বোর্ডের জন্য একটি ডায়নামিক ওয়েবসাইট তৈরি করা যেতে পারে।
খ. ক্রাউডফান্ডের আদলে সরকারি জাকাত তহবিলে অর্থ সংগ্রহে একটি সরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম (zakat.gov.bd)) তৈরি করা যেতে পারে। বিগত সরকার আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কোভিডের সময় এরূপ একটি ডিজিটাল অ্যাপ (A2I) চালু করেছিল, সেটি পরীক্ষা করে কাস্টমাইজ করা যেতে পারে।
গ. দেশের পুরো জাকাত ব্যবস্থাপনাকে মনিটর করতে আরেকটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে; যার মাধ্যমে জাকাত ব্যবস্থাপনাকারী ও জাকাত ব্যবহারকারী সব প্রতিষ্ঠানকে মনিটরিংয়ের আওতায় আনা যেতে পারে।
জাকাত সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি
প্রথমত, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও জাকাতের মতো একটি ফরজ ইবাদত সম্পর্কে তারা ততটা সচেতন নয়। দ্বিতীয়ত, দেশের মসজিদের ইমাম-খতিব, ইসলামিক স্কলার ও ওয়ায়েজিনরাও ইসলামের অন্যান্য ইবাদত সম্পর্কে প্রচুর আলোচনা করলেও তাদের জাকাত সম্পর্কিত আলোচনা অপেক্ষাকৃত বেশ কম। জুমার খুতবায় সীমিত আলোচনা করা হয়। তৃতীয়ত, দেশে জাকাত সম্পর্কিত বই-পুস্তকও বেশি নেই। বিভিন্ন মাদরাসা, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম ও সিলেবাসেও জাকাত তেমন গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। চতুর্থত, সরকারি পর্যায়ে জাকাত সম্পর্কিত আলোচনা ও গুরুত্ব প্রদান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই প্রথম করেছেন।
নিম্নলিখিত সুপারিশের আলোকে জাকাত সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা যেতে পারে :
ক. ইসলামিক ফাউন্ডেশন একটি জাকাত খুতবার খসড়া তৈরি করতে পারে এবং তা জাকাত-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ডের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা যেতে পারে।
খ. সব মসজিদের ইমাম-খতিবদের সারা বছরে সাপ্তাহিক ৫২টি জুমার খুতবার মধ্যে অন্তত ১২টি খুতবায় জাকাত সম্পর্কে আলোচনা করে মুসল্লিদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করতে পারেন।
গ. ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণে জাকাত-বিষয়ক মডিউল অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। সেই সাথে তাদের দারিদ্র্যবিমোচন ও মানবকল্যাণে জাকাত বিতরণ কর্মসূচি বা প্রকল্প প্রণয়নে প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে।
ঘ. রেডিও, টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমে জাকাত-বিষয়ক মানসম্মত আলোচনাভিত্তিক অনুষ্ঠান চালু করতে সরকার (তথ্য মন্ত্রণালয়) বিশেষ নির্দেশনা দিতে পারে।
ঙ. স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার কারিকুলাম, সিলেবাস ও পাঠ্যপুস্তকে জাকাত ও ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন (জাকাত, সাদাকা, ওয়াক্ফ, কর্জে হাসানা) বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার (শিক্ষা মন্ত্রণালয়) উদ্যোগ নিতে পারে।
চ. জাকাতকে যদি সরকারি রাজস্বের অন্যতম উৎস হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে জনগণের মধ্যে জাকাত সম্পর্কে জানার একটি আগ্রহ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়াও যদি ইসলামী সামাজিক অর্থায়নকে সরকারের বার্ষিক বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে অতি দ্রুত সরকারি কর্মকর্তা ও সব স্টেকহোল্ডারের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হবে।
ছ. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জাকাত ও ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন বিষয়গুলো নিজেদের কারিকুলাম ও সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্দেশনা-পরামর্শ দিতে পারে। এ ছাড়া গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাকাত ও ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন কিভাবে দারিদ্র্যবিমোচনে কার্যকর অবদান রাখতে পারে, সে সম্পর্কে গবেষণাকার্যক্রম হাতে নিতে বলা যেতে পারে।
জাকাত ব্যবস্থাপনার সাথে সরকারের কর কাঠামোর সমন্বয় সাধন
প্রথমত, বর্তমানে আয়কর আইন-২০২৩-এর ধারা ৭৬ এর উপধারা (১) এর ক্ষমতা বলে ওই আইনের ষষ্ঠ তফসিলের অংশ ৩-এর দফা (১৩) এর আওতায় কোনো জাকাত প্রদানকারী ‘সরকারি জাকাত ফান্ড’ বা অন্যান্য সরকার অনুমোদিত জাকাত ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে জাকাত দিলে তাকে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে ১৫ শতাংশ কর রিবেট দেয়া হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, জাকাতকে শুধু ব্যক্তিগত বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা শরিয়াহসম্মত কি-না তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ, আয়কর আইনে কোনো জাকাত প্রদানকারী কোম্পানির জন্য কর রেয়াত বা অব্যাহতির বিধান রাখা হয়নি। বস্তুতপক্ষে দেশে অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আছে যারা কোম্পানির জাকাত দিতে আগ্রহী; বিদ্যমান আইন তাদের অনুকূলে না থাকায় তারা স্বচ্ছতার সাথে জাকাত আদায় করতে পারছে না। তৃতীয়ত, আয়কর আইন-২০২৩ এর ধারা ৩৪১-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ষষ্ঠ তফসিলের অংশ ২ এর দফা (১) এর (ঘ) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জাকাত প্রদান করা হলে তাকে সম্পূর্ণ কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানকে এরূপ অব্যাহতি দেয়া হলে তা স্বচ্ছতার সাথে এবং ন্যায়ানুগভাবে অন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানকেও দেয়া উচিত।
নিম্নলিখিত সুপারিশের আলোকে জাকাত ব্যবস্থাপনার সাথে সরকারের কর কাঠামোর সমন্বয় সাধন করা যেতে পারে :
ক. বিদ্যমান আয়কর আইন পর্যালোচনা করে জাকাতকে ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে গণ্য করার পরিবর্তে ‘সামাজিক অনুদান’ হিসেবে গণ্য করে তাকে করমুক্ত ঘোষণা করা এবং কেউ যে পরিমাণ জাকাত দেবে সেই পরিমাণ টাকা তাকে আয়কর থেকে বিয়োগ করতে আইন বা বিধি-বিধান প্রণয়ন করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, বিভিন্ন মুসলিম দেশে এরূপ বিধান আছে যা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।
খ. জাকাতকে ব্যক্তির দায়-দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করার পাশাপাশি কোম্পানির জন্যও দায়-দায়িত্ব হিসেবে বিধি প্রণয়ন করা যেতে পারে। যেসব কোম্পানি জাকাত প্রদান করবে তাদেরও সমপরিমাণ কর অব্যাহতি দেয়া যেতে পারে। এরূপ আইন করা হলে বহু ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান জাকাত প্রদানে এগিয়ে আসবে। তাতে আয়কর হয়তো সামান্য হ্রাস পেলেও জাকাত তহবিলের প্রবৃদ্ধি ঘটবে, যা দারিদ্র্যবিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির জন্য তহবিল তৈরি করবে।
গ. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও জাকাত বোর্ড পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে জাকাতদাতা চিহ্নিতকরণ ও তাদের কর অব্যাহতি প্রদানের কাজটি ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদন করতে পারে।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব



