দিল্লির কল্পকাহিনীর ঝড়ে ঢাকা অনড়

তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। ঢাকা এখন পর্যন্ত বলে আসছে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। একই সাথে বাংলাদেশ ও ভারতের চিন্তকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসিনার পুনর্বাসন ও দুই দেশের সম্পর্কের নতুন ধারা সংযোজন নিয়ে যে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন তাতে এসব তথ্যের কতটা সত্যি, কতটা অনির্ভরযোগ্য তা নিয়ে বিস্তর ফারাক রয়েছে। বাস্তবে বাংলাদেশে নির্বাচিত নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক রিসেট নাকি হাসিনাকে ভারতে রেখেই আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন কোনটি চূড়ান্ত করবে তা নিয়ে ভারতের অবস্থানে মনে হচ্ছে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দি ট্রিবিউনে জয়তী মালহোত্রা দাবি করছেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে না দিলে ব্রিকস সম্মেলনে আসবেন না তারেক রহমান। আবার এনডিটিভি বলছে এ মাসের শেষ সপ্তাহে ভারত সফরে আসছেন তারেক রহমান। সর্বশেষ তারেকের ভারত সফর নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। ঢাকা এখন পর্যন্ত বলে আসছে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। একই সাথে বাংলাদেশ ও ভারতের চিন্তকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসিনার পুনর্বাসন ও দুই দেশের সম্পর্কের নতুন ধারা সংযোজন নিয়ে যে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন তাতে এসব তথ্যের কতটা সত্যি, কতটা অনির্ভরযোগ্য তা নিয়ে বিস্তর ফারাক রয়েছে। বাস্তবে বাংলাদেশে নির্বাচিত নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক রিসেট নাকি হাসিনাকে ভারতে রেখেই আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন কোনটি চূড়ান্ত করবে তা নিয়ে ভারতের অবস্থানে মনে হচ্ছে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

জেন জি আলফা রেভ্যুউলিশন

ভারতে পলাতক ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেনের সাক্ষাৎকার নিয়ে এক প্রতিবেদনে দি প্রিন্ট বলছে খুব শিগগিরই বাংলাদেশে এবার জেন জি আলফা রেভ্যুউলিশন ঘটবে। বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলন আওয়ামী সরকারের পতনের জন্যে ডিপস্টেটের এক ষড়যন্ত্র ছিল এবং তা নস্যাৎ করে দিতে জেন জি আলফা রেভ্যুউলিশনের প্রস্তুতি চলছে ভারত এবং বাংলাদেশে। ভারতীয় চিন্তক বীণা সিক্রি, রিভা গাঙ্গুলি, রাধা দত্ত, জুলাই আন্দোলনকে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান মানতে নারাজ। এরাও এ বিপ্লবকে মেটিকুলাস ডিজাইন বলে অ্যাখ্যা দিচ্ছেন। আনন্দবাজারে ভারতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে নেত্রী হাসিনার সাথে নিজে ও বিপুলসংখ্যক আওয়ামী নেতাকর্মীর একযোগে বাংলাদেশে উত্তাল গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টির আভাস দিয়েছেন। এদের সবার টার্গেট ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসার হাসিনার ঘোষণাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।

ভারতের চাওয়া

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী বাংলাদেশী কর্নেল মুস্তাফিজুর রহমান তার এসএফ মিডিয়া নিউজে বলেছেন, র-এর প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায় সফরে এসে দাবি তোলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে এলে তার বিরুদ্ধে যতগুলো মামলা রয়েছে তা বাতিল করতে হবে। বিচার করলে নতুন মামলা দিয়ে বিচার করতে হবে। তাকে এসএসএফ’র নিরাপত্তা দিতে হবে। তাকে রাখতে হবে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায়। এমনকি সাকিব আল হাসান, নওফেলের বাড়িতে হামলা অগ্নিসংযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করা হয়েছে ভারতের তরফ থেকে।

ভারতের স্ট্র্র্যাট নিউজ গ্লোবাল বলছে, পরাগ জৈনর ঢাকা সফর দু’দেশের মধ্যেকার নিরাপত্তা সম্পর্কের নীরব বিন্যাস ও হাসিনাকে ঘিরে উত্তেজনাময় বিতর্কের মধ্যে নিরাপত্তা চ্যানেল সচল রাখার প্রয়াস। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলা হচ্ছে হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে এলে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রকৃত বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করবে এবং ক্ষমতায় পুনরায় বিএনপিকে আনতে সবরকমের যথাসাধ্য চেষ্টা করবে ভারত। অর্থাৎ বাংলাদেশের নির্বাচনে জনগণ কাকে নির্বাচিত করবে তা অতীতে সুজাতা সিংয়ের ফরমুলা বাস্তবায়ন থেকে ভারত আদতে কোনো অবস্থান পরিবর্তন করেনি। হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়ে যাওয়ার পর তার পক্ষে কোনো আপিল না হলেও ফের কিভাবে তার বিরুদ্ধে নতুন মামলায় বিচার সম্ভব তা বিশ্লেষণ করতে যেয়ে সময় টেলিভিশনে একজন সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, বাচ্চু রাজাকারের (মাওলানা আবুল কালাম আজাদ) বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড হলেও তো তিনি এখন বাংলাদেশে ফিরেছেন, সরকার চাইলে সবই পারে।

বিরোধী দলের প্রাসঙ্গিকতা

টিভি টকশোতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইনক্লুসিভ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে ইনক্লুসিভ নির্বাচনের কথা প্রথম বলেন ভারতের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী। তিনি বলেছিলেন, ইনক্লুসিভ নির্বাচন হলেই তা ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক কিভাবে রচিত হবে তখন দেখা যাবে। এখনো আলোচকরা সেই ধারা অনুসরণ করে বলছেন, আওয়ামী লীগকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দিতে হবে। দলীয় প্রতীকবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ব্যাপকমাত্রায় ফিরে আসবে এবং তার আগেই হাসিনা দেশে ফিরে এসে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ নিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশ নেবেন। তাদের একই আভাসের সাথে ভারতীয় চিন্তকদের বক্তব্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে। ভারতীয় ইউটিউব চ্যানেল স্কিল বাংলার উপস্থাপক বলছেন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে না থাকলে দেশটি পাকিস্তানের দখলে চলে যাবে এবং এর প্রভাব পড়বে ভারতেও।

বাংলাদেশ কারো দখলে যাবে না

তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মধ্যে দিয়ে এটা প্রমাণিত যে, বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের প্রেসক্রিপশনে আর চলবে না। বাংলাদেশের এই পরিবর্তন ভারত ততক্ষণ বুঝতে পারবে না যতক্ষণ না হাসিনা ও পলাতক আওয়ামী নেতাকর্মী, সচিব, পুলিশ কর্মকর্তা বা আর্মি জেনারেল ভারত ছাড়ছেন। ঢাকার অনড় অবস্থানের কারণে দিল্লি মুখে বলছে তারা গত ৫ আগস্টে হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করেন না; কিন্তু তার প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে বিষয়টি আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে আগাচ্ছে। হাসিনাকে ভারত হাতছাড়া করলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বলয় সৃষ্টির আর কোনো সুযোগ থাকে না দেশটির। ভারত সফরে জিয়াউর রহমান গেলে স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী তাকে হাসিনাকে ফিরিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানান। সেই অনুরোধ জিয়া মেনে নেন এবং এরশাদ চক্র ও হাসিনার পুনর্বাসনের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতি কিভাবে ভারতের নতজানু হয়ে ওঠে তা সবার জানা। ভারত সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতেই আওয়ামী পুনর্বাসন চাইছে কেবল। যদিও ট্রিবিউনে জয়তী মালহোত্রা তার প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছেন ঢাকার ‘মুড’ পরিবর্তন হয়েছে এবং এতে দিল্লি অনেকটা ক্ষুব্ধ।

হাসিনার সেফ ল্যান্ডিং

ভারতীয় কূটনীতিকরা কোনো রাখঢাক না রেখে সরাসরি বলেন, হাসিনা পালাননি। তাকে বাংলাদেশের নিরাপত্তাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। টিভি টকশোতে ভারতীয় এই বক্তব্যের পুনঃধ্বনি শোনা গেছে অন্তত বাংলাদেশের একজন রাজনৈতিক গবেষক ও লেখক এবং এনবিআর’র সাবেক প্রধানের মুখে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে হাসিনা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দণ্ডিত আসামি হলেও তার ঢাকায় নিরাপদে পুনরায় ফিরে আসার ব্যাপারে এমন বয়ান তৈরির কলাকৌশলের মধ্যে দিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সিদ্ধ করার প্রয়াস ধীরে ধীরে মোড়ক খুলছে। মোড়কের পাতায় পাতায় বলা হচ্ছে কার্যকর বিরোধী দল নেই। সেমিনারে বক্তারা বলছেন, সংসদে ও সংসদের বাইরে এত দুর্বল বিরোধী দল আর কখনো দেখা যায়নি।

আওয়ামী পুনর্বাসনের ফাঁদ

র-এর প্রধানের সফরসঙ্গী হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন শৈবাল রায় চৌধুরী। এই বৈঠকে মোবাইল মনিটরিং কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারতের আগ্রহ বিস্ময়কর। কারণ ইসরাইলের কাছ থেকে ভারত মোবাইল ফোনে আঁড়িপাতা যন্ত্র কিনেছে এবং বাংলাদেশে তা ব্যবহার করে আওয়ামী পুনর্বাসনে বৈরী রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবেলা করতে চাচ্ছে ভারত। এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, হাসিনার প্রত্যর্পণ ও বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের নতুন রূপরেখা না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়া ঠিক হবে না। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জয়লাভের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা শাহজালাল বিমানবন্দরে মর্যাদার সাথে ফিরবেন এবং লাখো জনতা তাকে স্বাগত জানাবেন।

তারেকের সফর নিয়ে ভারতীয় তাগিদ

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানকে সমবেদনা জানান। ঢাকা আশ্বস্ত হয়েছিল নির্বাচিত নতুন সরকারের সাথে দিল্লি সুসম্পর্ক রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে; কিন্তু আওয়ামী লীগের সাথে যে সম্পর্ক সেই একই সম্পর্ক ভারত বাংলাদেশের সাথে রাখতে চাচ্ছে। একই দাঁড়িপাল্লায় তারেক ও হাসিনাকে মাপতে চাচ্ছে ভারত। এ কারণেই ভারতে প্রপাগান্ডা চলছে তারেক রহমান ভারত সফরে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং হাসিনা ও তারেক এক জিনিস নয় সেটি বুঝতে চাচ্ছে না দিল্লি। মোদি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তারেক রহমান তাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। মোদি দেখাতে চাচ্ছেন তারেকের ওপর তার প্রভাব রয়েছে যেমন আছে হাসিনার ওপরে। অন্য দিকে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের মধ্যেও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অক্ষুণœ রাখার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন তারেক। সম্পর্কের বাস্তবতা যত গভীর হোক না কেন, তার সীমাবদ্ধ রেখা ভারত নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রয়োজনে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র কার সক্ষমতা কতটা তা যাচাই করছে ঢাকা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন বটে তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে, তিনি এও বলেছেন, জুলাইয়ের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি আছে; কিন্তু ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগাবে কি না তা তারাই ভেবে দেখবে। ‘যতদিন ব্র্হ্মপুত্রের পানি বইবে আমরা ভারত মাতার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব’ শেখ মুজিবুর রহমানের সেই আবেগীয় ও নতজানু রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিমূল থেকে জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশকে সরিয়ে এনেছে।