আপিল বিভাগে পঞ্চদশ সংশোধনী সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন

সাংবিধানিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি মামলার শুনানি এবং রায় দেয়ার ক্ষেত্রে আদালত নজিরবিহীন গতি দেখিয়েছেন। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে আপিলগুলোর ওপর যুক্তিতর্ক শেষ করে তা নিষ্পত্তি করে দেয়া হয়েছে। এখন কেবল একটিই প্রত্যাশা, আর তা হলো, যে ঝড়ো গতিতে এই আপিলের শুনানি শেষ করা হলো, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের আইনি যুক্তি ও বিশ্লেষণের গভীরতায় যেন সেই তাড়াহুড়ার ছাপ স্পষ্ট না পড়ে

এহসান এ সিদ্দিক
এহসান এ সিদ্দিক |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

গত ৯ জুলাই বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটে। এদিন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সুশীলসমাজের প্রতিনিধি সংগঠন ‘সুশাসনের জন্য নাগরিকে’র (সুজন) প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের দায়ের করা আপিলটি খারিজ করে দেন। আপিলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ওপর হাইকোর্ট বিভাগের দেয়া আগের রায়কে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। হাইকোর্ট বিভাগ অবশ্য এর আগেই পঞ্চদশ সংশোধনীর বেশ কিছু ধারাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছিল। সেই তালিকায় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি। পাশাপাশি, সংবিধানের ‘৭ক’ ও ‘৭খ’ অনুচ্ছেদ দু’টিকেও হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে। এই দু’টি অনুচ্ছেদের মাধ্যমেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো নতুন ‘সাংবিধানিক অপরাধের’ বিধান সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে সংবিধানের মূল ধারাগুলো পরিবর্তনের পথ চিরতরে বন্ধ করার কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তবে হাইকোর্ট বিভাগ পুরো পঞ্চদশ সংশোধনীকে একেবারে বাতিল না করে, কেবল সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নির্দিষ্ট অংশগুলোই ছেঁটে ফেলে এবং সংশোধনীর বাকি অংশগুলো বহাল রাখে। কিন্তু জনাব মজুমদার শুরু থেকেই যুক্তি দিয়ে আসছিলেন, সম্পূর্ণ পঞ্চদশ সংশোধনীই অসাংবিধানিক এবং একে পুরোপুরি অবৈধ ঘোষণা করা উচিত। আপিল বিভাগ তার এই বৃহত্তর আইনি চ্যালেঞ্জ প্রত্যাখ্যান করায় শেষ পর্যন্ত আপিলটি খারিজ হয়ে যায়। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে, আমি বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী, সরকার পক্ষ এবং এই মামলায় যুক্ত বিভিন্ন পক্ষ ও মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে উত্থাপিত আইনি যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করব।

২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বরের রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ পুরো পঞ্চদশ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর পরিবর্তে আদালত সংশোধনীর প্রতিটি ধারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে এবং কেবল সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক সুনির্দিষ্ট অংশগুলোই বাতিল করে দেয়। এর মধ্যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া ‘৭ক’ এবং ‘৭খ’ অনুচ্ছেদ দু’টিও ছিল। অনুচ্ছেদ ৭ক সংবিধানে এমন এক বিপজ্জনক আইন তৈরি করেছিল, যার ফলে গণ-অভ্যুত্থান বা ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মতো গণ-আন্দোলনগুলোকে অসাংবিধানিক এবং মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, এই ধারাটি জনগণের বাকস্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদের অধিকারের ওপর এক অগ্রহণযোগ্য ও অন্যায় নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছিল। একইভাবে ৭খ অনুচ্ছেদও বাতিল করা হয়। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, এই বিধানের মাধ্যমে সংবিধানের বিস্তৃত অংশ ভবিষ্যতে সংশোধনের সুযোগ কার্যত বন্ধ করে দেয়া হয়, ফলে ভবিষ্যতের সংসদগুলোর সাংবিধানিক সংশোধনী প্রণয়নের ক্ষমতা অযৌক্তিকভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এ ছাড়া সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তও হাইকোর্ট বিভাগ অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে। এই রক্ষাকবচ কেড়ে নেয়ার মাধ্যমে পঞ্চদশ সংশোধনী মূলত আমাদের সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ স্বয়ং ‘গণতন্ত্র’কেই দুর্বল করে দেয়। ঠিক এ কারণেই আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। তবে পঞ্চদশ সংশোধনীর বাকি অংশগুলোকে অক্ষুণ্ন রাখেন।

হাইকোর্ট বিভাগের এই রায়ে জনাব বদিউল আলম মজুমদার সন্তুষ্ট হতে না পেরে সঙ্গতকারণেই আপিল করেন। তার মূল যুক্তি ছিল, পঞ্চদশ সংশোধনী কেবল একে অপরের সাথে সম্পর্কহীন কিছু সাংবিধানিক পরিবর্তনের সমষ্টি ছিল না; বরং এটি ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরাচারী শাসন দীর্ঘস্থায়ী করার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক মহাপরিকল্পনার অংশ। ফলে পুরো সংশোধনীই অসাংবিধানিক ঘোষণা করা উচিত। তার আইনজীবী আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর বেশ কয়েকটি ধারা শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি তৈরি করেছিল, যা একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। উদাহরণ হিসেবে তিনি বিশেষভাবে অনুচ্ছেদ ‘৪ক’-এর উল্লেখ করেন, যার মাধ্যমে দেশের সব সরকারি অফিস এবং বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়। আপিলকারীর মতে, এই ধারাগুলোই প্রমাণ করে যে, সংশোধনীর উদ্দেশ্য কেবল সংবিধান সংশোধন করা ছিল না, বরং রাষ্ট্রকাঠামোকে একজন একক রাজনৈতিক নেতার পরিচয়ে নতুন করে সাজানোই ছিল বিশেষ লক্ষ্য। অন্য দিকে সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর অনেক বিষয় ছিল মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার; যা আদালতের মাধ্যমে বাতিল না করে একটি নির্বাচিত সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত। অন্যান্য অনেক আইনজীবীও আদালতে একই ধরনের বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে বলেন, সংশোধনীর মাত্র কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি থাকায় পুরো সংশোধনীটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তারা উল্লেখ করেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এমন কিছু পরিবর্তনও আনা হয়েছিল যা সর্বমহলে কল্যাণকর হিসেবে বিবেচিত। যেমন- ২০১০ সালে আপিল বিভাগের এক রায়ের পর সংবিধান থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ‘বিসমিল্লাহির-রহমানির-রাহিম’ শব্দগুচ্ছ এই সংশোধনীর মাধ্যমেই সংবিধানে পূর্ণ মর্যাদায় ফিরিয়ে আনা হয়। এ ছাড়া পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও আদিবাসীদের অনন্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সুরক্ষায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার ধারাগুলোও এই সংশোধনীর মাধ্যমেই যুক্ত হয়। এই ইতিবাচক ধারাগুলোর সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাই আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, আপত্তিকর ধারাগুলো সংশোধনীর বাকি অংশ থেকে সহজেই আলাদা করা সম্ভব। আদালত চাইলে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপের সিদ্ধান্ত এবং অনুচ্ছেদ ৭ক ও ৭খ বাতিল করে বাকি ভালো ধারাগুলো বহাল রাখতে পারেন। হাইকোর্ট বিভাগ ঠিক এই কাজটিই করেন এবং আপিল বিভাগেও অধিকাংশ আইনজীবী সেই রায়ই বহাল রাখার পক্ষে সওয়াল করেন।

তবে অধিকাংশ আইনজীবীই আদালতের সামনে আরেকটি বড় ত্রুটি তুলে ধরেন; আর তা হলো, হাইকোর্ট বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে পুরোপুরি বা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। কাগজে-কলমে তারা এই ব্যবস্থা তুলে দেয়াকে অবৈধ বলেছেন ঠিকই, কিন্তু এটি চালু করার জন্য যেসব অতি প্রয়োজনীয় আইনি বিধান দরকার ছিল, তার বেশ কয়েকটি তারা পুনরুজ্জীবিত করেননি। উদাহরণস্বরূপ, একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টাদের শপথগ্রহণ সংক্রান্ত যেসব সাংবিধানিক প্রবিধান ছিল, হাইকোর্ট তা পুনরুজ্জীবিত করেননি। ফলস্বরূপ, আদালত নীতিগতভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে তুললেও, বাস্তব ক্ষেত্রে এটি দিয়ে কাজ চালানো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না; কারণ এর আইনি কাঠামোর অনেকগুলো অত্যাবশ্যকীয় অংশ তখনো অনুপস্থিত ছিল। এই কারণেই আইনজীবীরা আপিল বিভাগের কাছে আবেদন জানান, তারা যেন হাইকোর্টের এই ত্রুটিগুলো সংশোধন করে দেন এবং পুনরুদ্ধার করা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বাস্তব ক্ষেত্রে পুরোপুরি কার্যকর ও সচল করার ব্যবস্থা করেন।

৯ জুলাই ২০২৬ আপিল বিভাগ যখন তাদের সংক্ষিপ্ত আদেশটি দেন, তখন তারা কেবল এটুকু ঘোষণা করেন যে, আপিলটি খারিজ করা হয়েছে। প্রায় সব আইনজীবীই হাইকোর্টের রায়ে যে বড় বড় আইনি শূন্যতা বা ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিয়েছিলেন (যেমন-প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের শপথসংক্রান্ত সাংবিধানিক ধারাগুলো ফিরিয়ে না আনা), আপিল বিভাগ তার কোনো সমাধান করেছে কি না, আদেশে তার কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। এই মারাত্মক ত্রুটিগুলো শেষ পর্যন্ত সংশোধন করা হলো কি না, তা জানতে আমাদের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। তবে এখনই একটি বিষয়ে অন্তত মন্তব্য করা যায়, এত বিশাল সাংবিধানিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি মামলার শুনানি এবং রায় দেয়ার ক্ষেত্রে আদালত নজিরবিহীন গতি দেখিয়েছেন। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে আপিলগুলোর ওপর যুক্তিতর্ক শেষ করে তা নিষ্পত্তি করে দেয়া হয়েছে। এখন কেবল একটিই প্রত্যাশা, আর তা হলো, যে ঝড়ো গতিতে এই আপিলের শুনানি শেষ করা হলো, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের আইনি যুক্তি ও বিশ্লেষণের গভীরতায় যেন সেই তাড়াহুড়ার ছাপ স্পষ্ট না পড়ে।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি