সম্প্রতি ১৮০ কর্মকর্তাকে উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। এই পদোন্নতিতে বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত-দুর্নীতি অনিয়মের ঘটনায় বিতর্কিত-প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রত্যাহারকৃত এমনকি অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাকেও পদোন্নতির ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে এসব ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনে নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এমন ঘটনায় সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার আগেই প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মেধা, সক্ষমতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে (মেরিটোক্র্যাসি) পদোন্নতি ও পদায়নের জোরালো ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচিতেও মেরিটোক্র্যাসির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়। তবে সরকার গঠনের চার মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের বাস্তব চিত্রে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ওঠেছে। উল্টো অনেক সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ দিয়ে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে সংযুক্ত করা হয়েছে। অন্য দিকে বিতর্কিত-দণ্ডপ্রাপ্ত-দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন করা হচ্ছে।
পদোন্নতি তালিকায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা : পদোন্নতি তালিকায় ৫৩ নম্বরে রয়েছে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে ১৪তম ব্যাচে যোগদান করা মো: মাইনুল হক ভূইয়া। এই কর্মকর্তা প্রশাসন ক্যাডারের ২৪তম ব্যাচের সাথে উপসচিব হিসেবে ২০১৮ সালে ডিএস পুলে যোগদান করেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটিডি) উপসচিব হিসেবে এই কর্মকর্তা গত ৩০ জুন অবসর উত্তর ছুটি (পিআরএল) এ গমন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংযুক্ত হওয়া ছাদেকুরের পদোন্নতি : কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে অবহেলার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংযুক্ত হওয়া ছাদেকুর রহমান পদোন্নতি পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তদন্ত চলছিল। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি। এদিন উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব হয়েছেন ১৮০ জন কর্মকর্তা। সেই তালিকায় ৬৭ নম্বরে রয়েছেন ছাদেকুর রহমান। এই কর্মকর্তা এখনো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত হিসেবে আছেন।
পদোন্নতি পেয়েছেন সেই দুলাল চন্দ্র সূত্রধর : ২০১৮ সালে কিশোরগঞ্জের ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের প্রায় ১৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে তা বস্তায় ভরে পালানো ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সেতাফুল ইসলাম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। জবানবন্দীতে তিনি বলেন, ওই টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়েছে। আত্মসাতে জড়িত হিসেবে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো: আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দুলাল চন্দ্র সূত্রধরসহ আরো কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেছেন তিনি। এই দুলাল চন্দ্র সূত্রধরের নাম রয়েছে পদোন্নতির তালিকার ২৫ নম্বরে।
এসএসবির সদস্য কারা ?
সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন দফতর, অধিদফতর, স্বশাসিত সংস্থার প্রধানসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রশাসনের শীর্ষ এই কমিটিতে পদাধিকার বলে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব। সদস্য হলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব।
এসএসবির এসব কর্মকর্তাদের বেশির ভাগের বয়স ৬৫ থেকে ৭৫ বছর পর্যন্ত। এসব কর্মকর্তা অতীতে অত্যন্ত মেধাবী হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভোগছেন। ফলে তাদের মেধার পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পাচ্ছে না সরকার। এ ছাড়া দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর প্রশাসনের বাইরে থাকায় তারা বর্তমানে কর্মরত ব্যাচগুলোর কর্মকর্তাদের চেনেন না। ফলে যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এসএসবির বৈঠক সম্পাদনে সহায়তা করেন। সদস্যরা প্রতিটি বৈঠকের জন্য ১০ হাজার টাকা করে সম্মানি নেন। বৈঠকের সদস্য, অ্যাজেন্ডাভুক্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগ, শাখা ও অধিশাখার কর্মকর্তা মিলিয়ে প্রায় ৫০ জনের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। প্রতি বৈঠকে প্রায় ৫০ হাজার টাকার খাবার কেনা হয়।
গত ঈদুল আযহার আগে এসএসবির বেশ কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে শোনা গেছে, অফিস শেষের পরে একটু সময় থাকলেই এসএসবি সভা করে সম্মানি নিয়ে কোরবানির গরু কেনার জন্য স্যাররা প্রতিদিন বৈঠকে বসেছেন।
সরকারি কর্মচারীরা অবসরে গমনের পরেও যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি প্রাপ্তির বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়।
নেটিজেনরা বলছেন, এর আগে বিভিন্ন পদক বা পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে মরণোত্তর প্রথা আমরা দেখেছি। কিন্তু অবসরোত্তর পদোন্নতির বিষয়টি এবারই আমাদের সামনে এলো। এক্ষেত্রে তারা এসএসবি এবং পদোন্নতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাণ্ডজ্ঞানহীনতাকে দায়ী করছেন, যা এক ধরনের রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।
যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতির জন্য সরকারের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও উপসচিব পদে পদোন্নতি বিধিমালা ২০০২-এ সুস্পষ্ট শর্তাবলী ও বিধান উল্লেখ থাকলেও অনেক অস্পষ্ট ও অজ্ঞাত বিষয় এসএসবি বৈঠকে বোর্ড সদস্যরা সামনে নিয়ে আসেন যে কারণে অনেক যোগ্য এবং পদোন্নতি শর্তপূরণকারী কর্মকর্তারা পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এ পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তারা কী কারণে পদোন্নতি পেলেন না তা অজানাই থেকে যায়।



