বাটে ফেলে কি ডাঁটে চলা যায়

চব্বিশের জুলাই বাংলাদেশের মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্ধকার ফুঁড়ে আলো জ্বেলে দিতে শিখে গেছেন তারা। তাকিয়ে দেখুন সীমান্তের দিকে, বিজিবি জওয়ানদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জনতা। প্রতিরোধে শামিল আছেন ঘরের বউ-ঝিরাও। এই মানব ঢাল ভেদ করার সাধ্য কি ‘বন্ধুদেশে’র আছে?

সীমান্তে সিনেমা চলছে। স্ক্রিপ্ট এসেছে দিল্লি থেকে। টান টান উত্তেজনা। শূন্যরেখায় হুলুস্থুল। বন্দুকের মুখে একেকটা পরিবারকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশের দিকে। তাদের ঠেকিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। আর বিজিবি সদস্যদের পেছনে দেয়াল হয়ে জেগে আছে হাজারো মানুষ।

রাতে ফ্লাডলাইট নিভিয়ে দিচ্ছে বিএসএফ। তারপর কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে মানুষের ছায়া। এই ছায়াগুলো দেখে ছুটে যান বিজিবি জওয়ানরা। শোরগোল তুলে ছুটে আসেন সীমান্তবাসী। তাদের টর্চের আলোয় দেখা যায় একদল আতঙ্কিত মানুষ। বাটে পড়েছেন তারা। বাটে পড়া এই দলের সামনে থাকে নারী ও শিশু। তাদের পথ আগলে দাঁড়ান বিজিবি জওয়ানরা। পেছন থেকে সাহস জোগান সীমান্তের লোকেরা। এভাবে একের পর এক পুশইন ঠেকিয়ে দেয়া হচ্ছে।

এমন পুশইনের ঘটনা কতগুলো ঘটেছে, কাগজে কলমে হিসাব নেই। কিছু পুশইন রুখে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। কিছু সম্ভব হচ্ছে না। এক হিসাব বলছে, মে মাসের শেষ থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে অন্তত ২০০ মানুষকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি ও স্থানীয়দের প্রতিরোধে পড়ে এই লোকগুলোকে রাত কাটাতে হচ্ছে শূন্যরেখায়। ঘুমাতে হচ্ছে ধানক্ষেতে কিংবা সীমান্তের কোনো খালের পাশে। তাদের মাথায় বৃষ্টি ঝরছে। পায়ে কাদা লাগছে। পেটে খাবার নেই। ক্ষুধায় আতঙ্কে কাঁদছে শিশুরা। কখনো মাথার ওপর থাকে কড়া রোদ। আরো বড় আতঙ্কের মতো দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীরা। তাদের কিছুই করার থাকে না।

Push-in-sym

কিছুই করতে না পারা এসব মানুষের ঠিকানা কী? এরা কি ভুঁই ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছেন? যদি তা-ই হয়, তাহলে কোনো ঠিকানা থাকার কথা নয়; কিন্তু গণমাধ্যমের ক্যামেরায় যা দেখা যাচ্ছে, যা শোনা যাচ্ছেÑ সবই বাংলা কথা। বাংলায় কথা বলছেন তারা। জানাচ্ছেন- তাদের ঠিকানা ভারতে। বেশির ভাগ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। তাদের ধরে নিয়ে আসা হয়েছে শূন্যরেখায়। তাদের নিয়ে রাজনীতি করছে নিজেদের দেশের সরকার। আসলে বাংলা বলাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কারো কারো।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে কাজ করতে দিল্লি গিয়েছিলেন ছয় শ্রমিক। সেখানে বাংলায় কথা বলছিলেন তারা। এতে বাংলাদেশী সন্দেহে আটক করে দিল্লি পুলিশ। পরিচয়পত্র দেখানোর সুযোগও দেয়া হয়নি। ছয় শ্রমিককে তুলে দেয়া হয় বিএসএফের হাতে। পরে বিষয়টি মীমাংসা করেছিলেন কলকাতার আদালত। কেবল বাংলায় কথা বললে বাটে পড়তে হয় না। কোনো মুসলমান বাংলায় কথা বললে তাদের বাটে পড়ার শঙ্কা থাকে বেশি। নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গেলে বাংলাদেশী বলে সন্দেহ করা হয়। এই সন্দেহের তালিকায় আছে দলিত হিন্দুরাও। একসময় আসতে পারে, পশ্চিমবঙ্গে একজন অন্যজনকে দেখলেই বাংলাদেশী বলে সন্দেহ করে বসতে পারে। জমি নিয়ে কারো সাথে ঝামেলা হলে তার নাম ‘বাংলাদেশী’ সন্দেহের তালিকায় উঠিয়ে দেয়ার অপচেষ্টাও করতে পারে কেউ কেউ। তখন শুধু নিচু জাতের হিন্দু নয়, উচ্চ বর্ণের হিন্দুরাও এর শিকার হতে পারে।

ঈদুল আজহার আগে গরু নিয়ে তুলকালাম করে হিন্দু খামারিদের বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে রাজ্য সরকার। গরু কোরবানিতে বিধিনিষেধ জুড়ে দেয়। এতে দাঙ্গাহাঙ্গামার শঙ্কা ছিল; কিন্তু পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তার সাথে সামাল দিয়েছেন মুসলমানরা। গরু ছাড়া অন্য পশু কোরবানি দিয়েছেন তারা। অথচ গরুর পেছনে বেশি লগ্নি ছিল হিন্দু খামারিদের। আর এই খামারিদের বড় অংশের ভোট গিয়েছিল বিজেপিতে। তাহলে কী দাঁড়াল, মুসলমানদের বাটে ফেলতে গিয়ে নিজেদের লোকদের বাটে ফেলে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। কাউকে বাটে ফেলে বা বাটে ফেলতে চেয়ে কি ডাটে চলা যায়? অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে তো সেই গর্তে নিজেকেই পড়তে হয়।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল গর্ত খুঁড়েছিল ইরানের জন্য। শেষে কী দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ডাট ছুটে যাওয়ার দশা। অন্য দিকে ইরান পরিণত হচ্ছে আঞ্চলিক পরাশক্তিতে। আমাদের ‘বন্ধুদেশ’ও নিজেদের আঞ্চলিক পরাশক্তি মনে করে; কিন্তু অঞ্চলে প্রভাব ক্ষীণ। সবার সাথে খোঁচাখুঁচি করে। ডাট দেখাতে চায় বাটে ফেলে। বাটে ফেলতে তৈরি করে পুশব্যাক স্ক্রিপ্ট। কিন্তু বাংলাদেশ যে শেখ হাসিনা রেজিমের বাইরে চলে গেছে, সে হুঁশ এখনো হয়নি।

চাইলেও প্রতিবেশী বদলানো যায় না। সুতরাং প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। সুসম্পর্ক মানে এই নয়, প্রতিবেশীর স্ত্রী-সন্তানদেরও ভাগ করে নেয়া। পরস্পরের আশা-আকাক্সক্ষা ও বেদনা ভাগ করে নেয়া। সম্পর্ক তৈরি হয় পারস্পরিক সম্মান ও আস্থায়। চাপে রেখে সম্পর্ক ভালো করা যায় না। এতে এক দিকে দুই দেশের সম্পর্ক আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। অন্য দিকে তৈরি হচ্ছে মানবিক সঙ্কট। ভারতের নাগরিকরাই পড়ছেন এই সঙ্কটে, তাদের সরকারের অদূরদর্শী নীতির কারণে। এই নীতি বাংলাদেশকে নয়, আগামী দিনে ‘বন্ধুদেশে’র জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।

চব্বিশের জুলাই বাংলাদেশের মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্ধকার ফুঁড়ে আলো জ্বেলে দিতে শিখে গেছেন তারা। তাকিয়ে দেখুন সীমান্তের দিকে, বিজিবি জওয়ানদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জনতা। প্রতিরোধে শামিল আছেন ঘরের বউ-ঝিরাও। এই মানব ঢাল ভেদ করার সাধ্য কি ‘বন্ধুদেশে’র আছে?

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]