মোহাম্মাদ ওয়ালিউদ্দিন তানভীর
ফ্যাসিবাদ সবসময় সংবিধান ছিঁড়ে, আদালত বন্ধ করে কিংবা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে না। অনেকসময় নির্বাচন, সংসদ, আদালত, পুলিশ এবং প্রচলিত আইন অক্ষত রেখেই রাষ্ট্রের ভেতরে প্রবেশ করে। তারপর ধীরে ধীরে আইনকে ক্ষমতাসীন দলের অস্ত্রে পরিণত করে।
ফ্যাসিস্ট ইতালি ও নাৎসি জার্মানিতে রাষ্ট্রের আইনব্যবস্থা বাইরে থেকে এক দিনে ধ্বংস করা হয়নি। ক্ষমতা দখল, প্রতিষ্ঠানকে সহযোগী করে নেয়া এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলোকে রাজনৈতিকভাবে অধীন করার মধ্য দিয়ে দল ও রাষ্ট্রকে একীভূত করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে গত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতার বিষয়গুলো বুঝতে এই কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের শাসনকে রাজনৈতিকভাবে ‘ফ্যাসিবাদ’ বলা যেতে পারে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু আদালতে ‘ফ্যাসিবাদ’ কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ অপরাধের নাম নয়। কোনো ব্যক্তিকে শুধু ফ্যাসিস্ট, আওয়ামী লীগার, সরকারপন্থী কিংবা সাবেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা হওয়ার কারণে দণ্ড দেয়া যায় না।
আদালত মতাদর্শের বিচার করে না; আদালত অপরাধের বিচার করে। হত্যা, নির্যাতন, গুম, বেআইনি আটক, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, মানবতাবিরোধী অপরাধ, নির্বাচনী সহিংসতা, প্রমাণ ধ্বংস, দুর্নীতি এবং অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা- এসবের প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আইনি উপাদান প্রমাণ করতে হয়। কে আদেশ দিয়েছেন, কে আদেশ কার্যকর করেছেন, কে অর্থ বা অস্ত্র সরবরাহ করেছেন, কে অপরাধের তথ্য গোপন করেছেন এবং কে অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় থেকেছেন- বিচারের বিষয় এগুলোই।
সুতরাং প্রশ্নটি কেবল ‘আওয়ামী লীগের বিচার হবে কি না’ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হচ্ছে, দল, সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং দলীয় বাহিনীর মধ্যে যদি একটি সমন্বিত দমনব্যবস্থা গড়ে উঠে থাকে, তবে সেই ব্যবস্থার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় কিভাবে নির্ধারণ করা হবে।
দল যখন রাষ্ট্র হয়ে ওঠে
ফ্যাসিবাদী আইনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা বিলীন হয়ে যাওয়া। তখন নেতা, দল ও রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য মুছে যায় এবং আইন হয়ে ওঠে দলীয় রাজনীতির একটি অংশ। পুলিশ আর জনগণের পুলিশ থাকে না; ক্ষমতাসীন দলের হয়ে ওঠে। প্রশাসন দলীয় নির্দেশকে সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে বাস্তবায়ন করে। আদালতের স্বাধীনতা কাগজে থাকে; কিন্তু বিচারক নিয়োগ, পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা বণ্টনে রাজনৈতিক আনুগত্য বড় হয়ে ওঠে। আইনের প্রয়োগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও পক্ষপাত দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে।
বাংলাদেশে বিচার করতে হলে তাই কেবল মাঠপর্যায়ে গুলি চালানো পুলিশ সদস্যদের দিকে তাকালে চলবে না। তদন্তের আওতায় আনতে হবে আদেশের পুরো শৃঙ্খলকে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কোথা থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল? কারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিলেন? কোন রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, পুলিশ-প্রধান, গোয়েন্দা কর্মকর্তা কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তা কী জানতেন? কে কোন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন? কোন নির্দেশ লিখিত ছিল, আর কোন নির্দেশ মৌখিকভাবে দেয়া হয়েছিল? আহত ও নিহতের তথ্য কি গোপন করার চেষ্টা হয়েছিল? হাসপাতাল, মর্গ, থানার নথি কিংবা ডিজিটাল তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে খুঁজতে হবে।
এখানেই রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ফৌজদারি বিচারের মধ্যে পার্থক্য। রাজনৈতিকভাবে আমরা বলতে পারি, শাসনব্যবস্থা দমনমূলক ছিল; কিন্তু আদালতে বলতে হবে, কোন আসামি কী করেছেন এবং সেই কাজ কোন আইনের অধীনে অপরাধ।
ন্যুরেমবার্গের প্রধান শিক্ষা : অপরাধের দায় ব্যক্তিগত
স্বৈরশাসনের পতনের পর ন্যুরেমবার্গের উদাহরণ প্রায়ই সামনে আনা হয়। কিন্তু ন্যুরেমবার্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে- অপরাধের দায় ব্যক্তিগত। নাৎসি শাসনের ভয়াবহতা সত্ত্বেও প্রত্যেক জার্মান নাগরিককে অপরাধী ঘোষণা করা হয়নি। নাৎসি পার্টির প্রত্যেক সদস্যকেও একই মাত্রায় দায়ী করা হয়নি। নেতৃত্ব, পরিকল্পনা, জ্ঞান, অংশগ্রহণ এবং অপরাধে বাস্তব অবদানের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই নীতিটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনকে পার্থক্য করতে হবে মতামত, নৈতিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক সুবিধাভোগ এবং প্রত্যক্ষ অপরাধে অংশগ্রহণের মধ্যে। সবধরনের সহযোগিতা নৈতিকভাবে সমান নয়; আবার সব নৈতিক ব্যর্থতা ফৌজদারি অপরাধও নয়।
বিচার শুরু হতে হবে নেতৃত্বের শীর্ষ থেকে
বাংলাদেশের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সবচেয়ে বেশি দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মামলা প্রস্তুত করা। হাজার হাজার দুর্বল মামলা দিয়ে বিচারব্যবস্থা ভরিয়ে ফেলার চেয়ে অল্পসংখ্যক; কিন্তু প্রমাণসমৃদ্ধ নেতৃত্বের মামলা অনেক বেশি কার্যকর। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, পুলিশ কমান্ডার এবং দলীয় সশস্ত্র কাঠামোর নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাদের বাস্তব কর্তৃত্ব ও ভূমিকা প্রমাণ করতে হবে।
কেবল পদে থাকার কারণে কাউকে দোষী করা যাবে না। প্রসিকিউশনকে দেখাতে হবে, আসামির আদেশ দেয়ার ক্ষমতা ছিল কি না; তিনি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার তথ্য জানতেন কি না; তার অধীন ব্যক্তিদের থামানোর ক্ষমতা ছিল কি না এবং ক্ষমতা থাকার পরও তিনি অপরাধ প্রতিরোধ বা অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেননি কেন। এটি ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়ের মূল কথা।
কেউ সরাসরি ট্রিগার না টানলেও অপরাধের পরিকল্পনা, নির্দেশনা বা অনুমোদনের জন্য দায়ী হতে পারেন। বিচারের লক্ষ্য হবে সত্য প্রতিষ্ঠা।
আর্জেন্টিনার শিক্ষা : বিচার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া
আর্জেন্টিনায় সামরিক একনায়কতন্ত্রের পতনের পর সাবেক সামরিক জান্তার শীর্ষ নেতাদের বিচার হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক চাপ, ক্ষমা এবং আইনি প্রতিবন্ধকতায় বিচারপ্রক্রিয়া থেমে যায়; কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবার, আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মীরা হাল ছাড়েননি। বহু বছর পর বিচার আবার শুরু হয়।
বাংলাদেশের জন্য এখানেও শিক্ষা রয়েছে। একটি সরকার বা একটি ট্রাইব্যুনালের মেয়াদে সব অপরাধের বিচার শেষ হবে না। গুম, নির্যাতন, গোপন বন্দিশালা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভুয়া মামলা এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের বহু ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করতে বছরের পর বছর লাগতে পারে।
এ জন্য একটি স্থায়ী ও স্বাধীন তদন্ত এবং আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। সরকারি নথি, হাসপাতালের রেকর্ড, ডিজিটাল যোগাযোগ, ভিডিও, ছবি, টেলিফোন নির্দেশনা, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে।
সরকার পরিবর্তন হবে। সাক্ষী মারা যেতে পারেন। নথি হারিয়ে যেতে পারে। ডিজিটাল প্রমাণ মুছে ফেলা সম্ভব। কিন্তু রাষ্ট্রের স্মৃতি হারিয়ে গেলে বিচারও হারিয়ে যাবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার শিক্ষা
দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন একটি ভিন্ন পথ অনুসরণ করেছিল। সেখানে প্রকাশ্য শুনানি, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, সত্য উদঘাটন এবং শর্তসাপেক্ষ ক্ষমার ব্যবস্থা ছিল।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার মডেল সরাসরি অনুসরণ করা বাস্তবসম্মত বা ন্যায়সঙ্গত হবে না। মানবতাবিরোধী অপরাধ, পরিকল্পিত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের বিনিময়ে কেবল স্বীকারোক্তি গ্রহণ করে দায়মুক্তি দেয়া উচিত নয়।
তবে বিচার একা একটি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পুরো ইতিহাস তুলে ধরতে পারে না। একটি ফৌজদারি বিচার নির্ধারণ করে, নির্দিষ্ট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না। কিন্তু একটি ট্রুথ কমিশন অনুসন্ধান করতে পারে, কিভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল; কোন আইনগুলো নিপীড়নের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল; কারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছিল; কেন প্রশাসন, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের একাংশ নীরব বা সহযোগী হয়েছিল।
বাংলাদেশে একটি স্বাধীন ট্রুথ, দলিল সংরক্ষণ ও ক্ষতিপূরণ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। কমিশনটি ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিস্তার, গুম, নির্যাতন, রাজনৈতিক হত্যা, গোপন বন্দিশালা, নির্বাচনী কারচুপি এবং বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার তদন্ত করতে পারে।
তবে ট্রুথ কমিশন এবং ফৌজদারি আদালতের ভূমিকা আলাদা রাখতে হবে। কমিশনের প্রতিবেদনে কারো রাজনৈতিক বা নৈতিক দায়িত্বের কথা থাকতে পারে; কিন্তু কাউকে অপরাধী ঘোষণা করার ক্ষমতা কেবল স্বাধীন আদালতের।
প্রতিষ্ঠানগত সহযোগীদের দায় কী হবে
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসবে তাদের নিয়ে, যারা নিজের হাতে কাউকে হত্যা করেনি; কিন্তু দমনব্যবস্থা সচল রেখেছেন। পুলিশ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সদস্য, প্রসিকিউটর, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, দলীয় নেতা, অর্থদাতা এবং অপরাধের তথ্য সরবরাহকারী ব্যক্তিরা জেনেশুনে নির্দিষ্ট অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করে থাকলে তাদের বিচার হতে পারে; কিন্তু পূর্ববর্তী সরকারের আমলে চাকরি করার কারণেই কাউকে অপরাধী গণ্য করা যাবে না।
যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ আছে; কিন্তু ফৌজদারি দণ্ড দেয়ার মতো প্রমাণ নেই, তাদের ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন যাচাই বা ভেটিং প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে। বিশেষত পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং প্রসিকিউশন সার্ভিসের সংবেদনশীল পদে কারা থাকবেন, তা নির্ধারণে পেশাগত সততা যাচাই জরুরি।
এই প্রক্রিয়ায় অভিযোগ সম্পর্কে লিখিত নোটিশ, প্রমাণ দেখার সুযোগ, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, কারণসংবলিত সিদ্ধান্ত এবং আপিলের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
অন্যথায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আওয়ামী প্রভাবমুক্ত করার নামে পুরনো দলীয় প্রশাসন সরিয়ে নতুন আরেকটি দলীয় প্রশাসন বসানো হবে। এতে ফ্যাসিবাদের কাঠামো ভাঙবে না; কেবল সুবিধাভোগীর পরিচয় বদলাবে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দায়
আওয়ামী লীগের নেতা ও সদস্যদের ব্যক্তিগত দায়ের পাশাপাশি দলটির সাংগঠনিক ভূমিকাও তদন্ত করা প্রয়োজন। যদি প্রমাণিত হয় যে, দলের কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় কোনো অঙ্গ পরিকল্পিত সহিংসতা পরিচালনা করেছে, অস্ত্র বা অর্থ সরবরাহ করেছে, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে সহযোগিতা করেছে কিংবা অপরাধীদের রক্ষা করেছে, তবে স্বাধীন আদালত সেই সাংগঠনিক দায় নির্ধারণ করতে পারে।
কিন্তু দলটির প্রত্যেক সদস্য বা সমর্থককে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না। একটি দলের অপরাধী নেতৃত্বের বিচার, আর কোটি মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় নিষিদ্ধ করা এক বিষয় নয়।
ন্যায়বিচারের নামে যেন অবিচার না হয়
ফ্যাসিবাদের বিচারে বাংলাদেশ যদি নতুন করে অস্পষ্ট আইন তৈরি করে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গণগ্রেফতার চালায়, জোর করে স্বীকারোক্তি নেয়, আসামিকে আইনজীবী থেকে বঞ্চিত করে কিংবা আদালতকে নতুন ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণে দেয়, তবে আমরা একই পুরনো ভুল পুনরাবৃত্তি করব।
মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন বা দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের কথা বিবেচনা করা উচিত। মৃত্যুদণ্ড বিচারকে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত করে, প্রত্যর্পণ কঠিন করে এবং বিচারিক ভুল সংশোধনের সুযোগ চিরতরে বন্ধ করে দেয়।
অপরাধ যত গুরুতরই হোক, অপরাধীর পরিচয় দেখে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পরিবর্তিত হতে পারে না।
রাষ্ট্রকে বদলাতে হবে
কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, পুলিশ কর্মকর্তা বা দলীয় নেতাকে শাস্তি দিলেই ফ্যাসিবাদের অবসান হবে না। যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে নিপীড়ন চালানো হয়েছিল, সেগুলো সংস্কার না করলে ভবিষ্যতের কোনো সরকার একই অস্ত্র আবার ব্যবহার করবে।
বাংলাদেশের প্রয়োজন স্বাধীন পুলিশ কমিশন, গোয়েন্দা সংস্থার ওপর আইনি ও সংসদীয় নজরদারি, স্বাধীন প্রসিকিউশন সার্ভিস, স্বচ্ছ বিচারক নিয়োগ, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর স্বাধীন তদন্ত এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের কার্যকর সুরক্ষা।
গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে সত্য জানার অধিকার দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ উন্মুক্ত করতে হবে। কোন কর্মকর্তা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কোন আইন কিভাবে ব্যবহার হয়েছিল এবং কোন প্রতিষ্ঠানের কোথায় ব্যর্থতা ছিল- এসব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জানা দরকার।
প্রতিশোধ নয়, সাংবিধানিক পুনর্জন্ম
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিচার মানে শুধু শেখ হাসিনা বা কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিচার নয়। এর অর্থ হচ্ছে সেই পুরো কাঠামো উন্মোচন করা, যার মাধ্যমে দল, সরকার, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার অংশবিশেষকে একসাথে ব্যবহার করা হয়েছিল।
প্রকৃত বিজয় হবে তখন, যখন সাবেক শাসকরাও এমন একটি স্বাধীন আদালতে বিচার পাবেন, যে আদালত তাদের শাসনামলে তাদের বিরোধীরা পাননি।
এটাই প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের পার্থক্য এবং একটি দলীয় রাষ্ট্রের জায়গায় আরেকটি দলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ও একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র পুনর্গঠনের মধ্যকার পার্থক্যও এখানেই।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক



