যুদ্ধাপরাধের বিচার : প্রসিকিউশনের বয়ান নির্মাণ ও ইতিহাসের পুনঃপাঠ

প্রসিকিউশনের অনুরূপ বিচারিক কৌশলের আরেকটি উদাহরণ দেখা যায় আব্দুুল কাদের মোল্লার মামলায়। একাত্তরের ২৪ এপ্রিল মিরপুরের আলুবদী গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী মেতে উঠেছিল এক প্রলয়ঙ্করী রক্তখেলায়, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম বর্বরোচিত ও অমানবিক এক গণহত্যা। একাত্তরের ইতিহাসের পাতায় এই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়টি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বিশদভাবে নথিবদ্ধ আছে। কিন্তু ২০১০ সালের পূর্ববর্তী কোনো ঐতিহাসিক বিবরণে তৎকালীন জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এই গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠেনি। নাটকীয়ভাবে ২০১২ সালের ট্রাইব্যুনালে প্রথমবারের মতো প্রসিকিউশনের সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা দাবি করেন, গণহত্যার দিন তিনি আব্দুল কাদের মোল্লাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের সাথে উর্দু ভাষায় কথা বলতে দেখেন

যুদ্ধাপরাধের বিচারে রাষ্ট্রপক্ষ নিজস্ব কৌশল নিয়ে এগোচ্ছিল। ট্রাইব্যুনালে প্রথম কয়েকজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে শুরুর পর সেই কৌশল ক্রমে স্পষ্ট হয়। প্রসিকিউশনের মূল কৌশলটি ছিল এমন, মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনবিদিত ও ব্যাপকভাবে নথিবদ্ধ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো অবলম্বন করা এবং দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বেশি সময় পর, সেই সুপ্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের ফ্রেমে আসামিদের জোরপূর্বক সম্পৃক্ত করা।

ফলে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষীরা যখন মুক্তিযুদ্ধে ঘটা এমন সব আলোচিত সামরিক অভিযানের বর্ণনা দিচ্ছিলেন, যা আগে থেকে ইতিহাস গ্রন্থ, স্মৃতিকথা, পুরনো খবরের কাগজ কিংবা যুদ্ধের ইতিহাসে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ ছিল, সেখানে হঠাৎ করে প্রথমবারের মতো মওলানা নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মতো জামায়াত নেতাদের নাম যুক্ত হতে শুরু করল। বহুল আলোচিত এসব ঘটনার বর্ণনা খোদ বীর মুক্তিযোদ্ধা, কিংবা পাকিস্তানি ও ভারতীয় নথিপত্রেও বিশদভাবে রেকর্ড করা হয়েছিল। আগের সেসব নির্ভরযোগ্য বিবরণের কোথাও আসামিদের নাম গন্ধও ছিল না, কখনো থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে নয়।

ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় এসে এই ঐতিহাসিক আখ্যান বা বয়ানগুলো আমূল বদলে যেত। সেখানে সুপরিচিত ঘটনাগুলোয় আসামিদের একেক সময় একেক ভূমিকায় দাঁড় করানো হতো। কখনো তাদের দেখানো হতো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নীতিনির্ধারক বা উপদেষ্টা হিসেবে; কখনো তারা হাজির হতেন মূল সংগঠক, পরিকল্পনাকারী কিংবা নেপথ্যের মদদদাতা হিসেবে। আবার কোনো দৃশ্যে এমনভাবে চিত্রিত করা হতো; যেন তারা পুরো ঘটনাটি নীরব সমর্থক হিসেবে দাঁড়িয়ে দেখছেন ও অনুমোদন দিচ্ছেন।

প্রতিনিয়ত চেনা ইতিহাস বারবার নতুন করে সাজানো হচ্ছিল, তাতে যুক্ত করা হচ্ছিল এমন কিছু নতুন মুখ, পূর্ববর্তী কোনো নথি বা ইতিহাসে যাদের উপস্থিতি ছিল না। যার চূড়ান্ত ফল দাঁড়াল এই, একাত্তরে যাদের বয়স ছিল মাত্র উনিশ-বিশ বছর, তাদের রাতারাতি যুদ্ধের পরিকল্পনাকারী, মাঠপর্যায়ের কমান্ডার ও গোয়েন্দা সমন্বয়কারী বানিয়ে দেয়া হলো।

এই নিবন্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকে সুনির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরা হচ্ছে, যা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠবে পুরো প্রক্রিয়াটি কিভাবে কাজ করেছিল। প্রসিকিউশন ঠিক কিভাবে আসামিদেরকে একাত্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সাথে কৌশলে সম্বন্ধযুক্ত করার চেষ্টা করে।

মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রামাণ্য ও বহুল আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি জামালপুর যুদ্ধের ঠিক পূর্বমুহূর্তে ভারতীয় ও পাকিস্তানি সেনা কমান্ডারদের মধ্যে হওয়া পত্রবিনিময়। ঘটনাটি সম্পর্কে বাংলাদেশী, ভারতীয় ও পাকিস্তানি সূত্রগুলোর বর্ণনা প্রায় অভিন্ন। প্রচলিত প্রায় সব বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সী একটি সাদা পতাকা হাতে নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৯৫ মাউন্টেন ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হারদিত সিং ক্লেরের হাতে লেখা একটি চিঠি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের শিবিরে পৌঁছে দেন। চিঠিটি রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুলতান আহমেদের উদ্দেশে লেখা ছিল। তাতে তাকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। ব্রিগেডিয়ার হারদিত সিং চিঠিতে উল্লেখ করেন, পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান তখন সম্পূর্ণরূপে দুর্বল ও অরক্ষিত; আত্মসমর্পণ করলে অপ্রয়োজনীয় রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হবে। কিন্তু কর্নেল সুলতান সেই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। প্রস্তাবের জবাবে তিনি ভারতীয় বাহিনীকে কলম দিয়ে নয়, স্টেনগান দিয়ে যুদ্ধের আহ্বান জানান। চিঠির সাথে একটি গুলি সংযুক্ত করে তা ফেরত পাঠান।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর আগ পর্যন্ত এই যুদ্ধের সাথে বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের কোনো ঐতিহাসিক নথিতে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের কোনো সদস্যের উপস্থিতির উল্লেখ ছিল না; অথচ ঘটনার ৪০ বছর পর, ২০১২ সালের ১ আগস্ট জহুরুল হক মুন্সী প্রসিকিউশনের সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার পর ইতিহাস নতুনভাবে চিত্রিত হয়। তিনি দাবি করেন, যে দিন চিঠিটি হস্তান্তর করা হয়েছিল, সে দিন তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা এবং পরবর্তীতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুলতানের সাথে ক্যাম্পে উপস্থিত ছিলেন।

সাক্ষী এখানে থেমে থাকেননি, এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন তাকে আটকে রেখেছিল, তখন তার ভাগ্যের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছিল না। কারণ তৎকালীন কিশোর কামারুজ্জামান ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুলতান নাকি একসাথে সেতু পরিদর্শনে বাইরে গিয়েছিলেন। এর মানে দাঁড়ায়, কামারুজ্জামান কেবল ক্যাম্পে উপস্থিত ছিলেন না; বরং যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের সময় তিনি একটি সম্মুখসারির পাকিস্তানি রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসারের সাথে সামরিক পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন।

আমাদের জানা মতে, এটি ছিল প্রথম ঘটনা যেখানে একটি বহুল আলোচিত ও প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে পরবর্তীকালে একজন জামায়াত নেতার নাম সংযুক্ত করা হয়। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্য চলাকালে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে দেখা যায়। আলোচিত সামরিক অভিযান, বন্দিশিবির এবং গণহত্যার বিবরণে একের পর এক জামায়াত নেতাদের বানোয়াট উপস্থিতি দাবি করা হয়, যদিও ওই একই ঘটনা ঘিরে আগে প্রকাশিত ইতিহাসগ্রন্থ, স্মৃতিকথা ও সমসাময়িক বিবরণে তাদের কোনো ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায় না।

যে বিষয়টি জহুরুলের এই সাক্ষ্যকে আরো বেশি রহস্যময় করে তোলে তা হলো, এই ট্রাইব্যুনালের বেশ কয়েক বছর আগে, ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে ‘আলোর মিছিল’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি জামালপুরের পুরো ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছিলেন। নিজের দেয়া সেই পুরনো বিবরণীতেও কিন্তু কামারুজ্জামানের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। নামটি প্রথমবারের মতো তখন সামনে আসে, যখন ২০১২ সালে জহুরুল ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে দাঁড়ান।

শফি ইমাম রুমী, বদিউল আলম বদি, আবদুল হালিম জুয়েল ও আলতাফ মাহমুদের ওপর নির্যাতন ও তাদের হত্যাকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নৃশংস এবং বহুল আলোচিত ঘটনা। বিচার শুরুর আগে পর্যন্ত মাওলানা নিজামী কিংবা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে এই নির্যাতন বা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ কখনো উত্থাপিত হয়নি। কিন্তু ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর মাওলানা নিজামীর মামলায় প্রসিকিউশনের দ্বিতীয় সাক্ষী বিচ্ছু জালাল এক বিস্ময়কর দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট তিনি নিজে আটকাবস্থায় এমপি হোস্টেলের কাছে একটি আটককেন্দ্রে রুমী, বদি, জুয়েল ও আলতাফ মাহমুদকে দেখেছিলেন। এখানেও মাওলানা নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদ ঠিক সময়মতো ঘটনাপ্রবাহে আকস্মিকভাবে আবির্ভূত হন। ঘটনার বর্ণনায় শুধু তাদের উপস্থিতির কথা বলা হয়নি; বরং অভিযোগ করা হয়, তারা ব্যক্তিগতভাবে নির্যাতন কার্যক্রম তদারকি করতেন। জালালের দাবি ছিল, রুমী, বদি, জুয়েল ও আলতাফ মাহমুদসহ অন্য বন্দীরা তাকে জানিয়েছিলেন, ক্যাম্পের নির্যাতনের জন্য মাওলানা নিজামী ও মুজাহিদ দায়ী। তিনি আরো বলেন, নিজামী নিজ হাতে পিস্তল দিয়ে তাকে আঘাত করেছিলেন, আর মুজাহিদ তার মাথায় আঘাত করেছিলেন। একাত্তরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় অভিযুক্তদের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উপস্থাপনের এই প্রবণতা প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যপ্রমাণে বারবার পরিলক্ষিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শহীদ রুমী, বদি, জুয়েল আর আলতাফ মাহমুদের নাম শোনেননি এমন মানুষ কমই আছেন। তাদের আটক এবং শহীদ হওয়ার ঘটনা নিয়ে বহু বছর ধরে অসংখ্য গ্রন্থ ও স্মৃতিচারণমূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু নিজামী আর মুজাহিদ যে নিজে হাতে তাদের অত্যাচার চালিয়েছিলেন কিংবা তাদের হত্যার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সাক্ষী হিসেবে বিচ্ছু জালালের এই দাবির আগে কোনো ইতিহাসগ্রন্থ বা দলিলে তা খুঁজে পাওয়া যায় না। এটিই প্রমাণ করে, এর ভেতরে বড় কোনো রহস্য আছে।

প্রসিকিউশনের অনুরূপ বিচারিক কৌশলের আরেকটি উদাহরণ দেখা যায় আব্দুুল কাদের মোল্লার মামলায়। একাত্তরের ২৪ এপ্রিল মিরপুরের আলুবদী গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী মেতে উঠেছিল এক প্রলয়ঙ্করী রক্তখেলায়, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম বর্বরোচিত ও অমানবিক এক গণহত্যা। একাত্তরের ইতিহাসের পাতায় এই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়টি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বিশদভাবে নথিবদ্ধ আছে। কিন্তু ২০১০ সালের পূর্ববর্তী কোনো ঐতিহাসিক বিবরণে তৎকালীন জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এই গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠেনি। নাটকীয়ভাবে ২০১২ সালের ট্রাইব্যুনালে প্রথমবারের মতো প্রসিকিউশনের সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা দাবি করেন, গণহত্যার দিন তিনি আব্দুল কাদের মোল্লাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের সাথে উর্দু ভাষায় কথা বলতে দেখেন। এভাবে চার দশক পর একটি সুপরিচিত ও নথিভুক্ত গণহত্যার ঘটনায় আরেকজন জামায়াত নেতাকে জড়ানো হয়।

এই নিবন্ধে আমরা মাত্র তিনটি উদাহরণ তুলে ধরেছি, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সুপ্রতিষ্ঠিত ও প্রামাণ্য ঐতিহাসিক ঘটনার দীর্ঘ ৪০ বছর পর হঠাৎ করে বিরোধীদলীয় নেতাদের নাম কূটকৌশলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে এসব উদাহরণ আসলে সামগ্রিক বিচার প্রক্রিয়ার কয়েকটি ছোট অংশ মাত্র। আমরা দেখেছি, পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীরা চতুরতার সাথে আলোচিত ঘটনায় ইতিহাসে আগে কখনো নাম না থাকা ব্যক্তিদের রাতারাতি সেসব ঘটনার মূল চরিত্র বানিয়ে দিয়েছেন।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি