দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রতিক সময়ে কন্যাশিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েছে। অবস্থা এমন যে- ঘরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও জনপরিসরে কোথাও শিশুরা পুরোপুরি নিরাপদ নয়। শিশুদের প্রতি সহিংসতা, কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও নৈতিক সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি। শিশু নির্যাতনের অবস্থা এত ভয়াবহ যে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইনে শিশু যৌন হয়রানি-সংক্রান্ত পাঁচ হাজার ৮৫৩টি কল এসেছে। এর মধ্যে ৫২০টি কল এসেছে, যেসব ঘটনায় শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতি বছর এ ধরনের কলের সংখ্যা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রে-আসকের তথ্য, চলতি বছরের পয়লা জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার। ধর্ষণচেষ্টার শিকার ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। এদিকে চলতি মাসে ২০ দিনে (১ থেকে ২০ মে পর্যন্ত) ধর্ষণের শিকার ২৪ শিশু। ধর্ষণচেষ্টার শিকার ১২ জন এবং ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় পাঁচ হাজার ৯৫৮টি মামলা হয়েছে।
গণমাধ্যমে সম্প্রতি প্রকাশিত ধর্ষণ ও হত্যার পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব ক’টিতে শিশুরা প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনের শিকার হয়েছে। সর্বশেষ পল্লবীর ঘটনা আমাদের শিউরে দিয়েছে। এই ঘটনা সারা দেশে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আসলে সামাজিক অবক্ষয় এবং শিশুরা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় শিশুধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। একই সাথে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাক্সিক্ষত কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে না ওঠাও এর জন্য দায়ী।
সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাগুলো শুধু যৌন সহিংসতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে আছে বহুমাত্রিক সামাজিক, মানসিক ও কাঠামোগত কারণ। ভুক্তভোগীকে হত্যা করলে প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির ঝুঁকি থাকবে না- এমন ধারণা করেও অপরাধীরা হত্যা করে। মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক অবক্ষয় অপরাধের মনস্তত্ত্বকে আরো জটিল করে তুলেছে।
আমরা মনে করি, অপরাধ দমনে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। এ জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া অপরাধীদের সাহসী করে তোলে। তাই দ্রুত ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতীয় শিশুনীতি-২০১১ শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ ও সুরক্ষার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে বিচার বিলম্ব, দুর্বল আইন প্রয়োগ ও সামাজিক নীরবতা পরিস্থিতি জটিল করছে। দ্রুত বিচার, কার্যকর শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার করে দেশে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। মনে রাখা দরকার, শিশুরা নিরাপদ না থাকলে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিরাপদ হবে না।



