১০ মাসে রাজস্বে বড় ঘাটতি

আদায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬০১ কোটি টাকা। সে হিসাবে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬০১ কোটি টাকা। সে হিসাবে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

গতকাল এনবিআরের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। তবে প্রবৃদ্ধি হলেও চলতি অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের মাধ্যমে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

সে হিসাবে ১০ মাসে আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি দুই মাসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে আরো প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে, যা বাস্তবতার বিচারে অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

অন্য দিকে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের আনুপাতিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এনবিআরের আদায় আরো বেশি হওয়ার কথা ছিল। সে বিবেচনায়ও রাজস্ব ঘাটতি উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মূল বাজেটে উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য

চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকার মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় এনবিআরের এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ উচ্চ প্রবৃদ্ধিনির্ভর। কিন্তু বাস্তবে প্রথম ১০ মাসে আদায় বেড়েছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি এখনো পিছিয়ে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে নামমাত্র রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এখনো চাপ রয়েছে। বিশেষ করে আমদানি কমে যাওয়া, শিল্পে ধীরগতি এবং ভোক্তা ব্যয় সঙ্কুচিত হওয়ার প্রভাব কাস্টমস ও ভ্যাট আদায়ে পড়েছে।

আয়কর ও ভ্যাটে গতি

এনবিআর সূত্রগুলো বলছে, চলতি অর্থবছরে ব্যক্তিগত আয়কর, করপোরেট কর এবং অভ্যন্তরীণ ভ্যাট আদায়ে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, ওষুধ ও তৈরি পোশাক খাত থেকে তুলনামূলক বেশি রাজস্ব এসেছে। তবে ডলার সঙ্কট, এলসি খোলায় নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্প কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় কাস্টমস শুল্ক আদায়ে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি হয়নি। বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামো এখনো আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে ধীরগতি দেখা দিলে সরাসরি তার প্রভাব পড়ে রাজস্ব আহরণে।

কর-জিডিপি অনুপাত নিম্নমুখী

অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। করজাল সম্প্রসারণের পরিবর্তে সীমিতসংখ্যক করদাতার ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়ানোর প্রবণতা এখনো রয়ে গেছে। তাদের মতে, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে কর কাঠামোর আওতায় আনা ছাড়া টেকসই রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।

বাজেট বাস্তবায়নে চাপ বাড়তে পারে

রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি অব্যাহত থাকলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় সঙ্কোচন, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ বাড়াতে হতে পারে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। একই সাথে সুদ পরিশোধ খাতে সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু করের হার বৃদ্ধি নয়, বরং স্বচ্ছতা, স্বয়ংক্রিয়তা ও জবাবদিহিভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তুলতে পারলেই দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব ব্যবস্থায় কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।