স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা

সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

দলীয় প্রভাব কমাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। অনেকে নির্দলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে স্থানীয় নেতৃত্ব বিকশিত হতে পারে। জনগণ চায়, সরকার আওয়ামী লীগের অনুসরণ নয়; বরং জনগণের ইচ্ছার মূল্যায়ন করুক, গণতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা করুক। অবিলম্বে স্থানীয় সরকারেরর নির্বাচন দিয়ে তৃণমূলে গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত রাখুক।

স্থানীয় সরকারব্যবস্থা তৃণমূলে গণতন্ত্র চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। এই নির্বাচন বরাবর গুরুত্ববহ। এটি কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়; বরং তৃণমূলে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার রাজনৈতিক অনুশীলন। সঙ্গতকারণে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার এ নির্বাচন হতে হবে দলীয় রাজনীতির ছায়ামুক্ত। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকাশের সুযোগ বাড়বে।

২০১৫ সালের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন মূলত নির্দলীয় ছিল। প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং স্থানীয় উন্নয়নে অবদান তখন ভোটের প্রধান নিয়ামক ছিল। আওয়ামী সরকার সেই ঐতিহ্য ধ্বংস করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালু করে। এর মাধ্যমে কার্যত স্থানীয় সরকারের ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এখন সেই স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশ গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে, এটিই কাম্য।

সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্থানীয় সরকারের প্রতিটি প্রশাসনিক ইউনিট পরিচালিত হবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেশে এর ব্যত্যয় ঘটছে। অথচ জাতীয় নির্বাচনের পরপর বিএনপি বলেছিল, দ্রুততম সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেয়া হবে। এখন নির্বাচন ছাড়াই দলীয় লোকদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিরোধী দল বলছে, সরকার গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত করে স্থানীয় সরকারের সব স্তরে দলীয়করণ করছে; এটি সংবিধানবিরোধী।

এমন দলীয়করণ অনাকাক্সিক্ষত। জনগণের দাবি ছিল, জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠানের। তখন বিএনপি সেই জনদাবি উপেক্ষা করে। এখন ক্ষমতায় গিয়ে স্থানীয় সরকারে দলীয়করণ করা হচ্ছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, দলীয়করণে জনগণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের জয়ের ব্যাপারে বিএনপির সংশয় আছে। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে নাকি নির্দলীয়ভাবে সে বিষয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট নয়। যদিও সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, এবারের নির্বাচন হবে নির্দলীয়ভাবে। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের কথার সাথে কাজের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

রাষ্ট্রসংস্কারের বিষয়ে সরকারের নেতিবাচক ভূমিকা, বিশেষ করে জুলাই সনদের পক্ষে গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। তাই এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিলে তা দলের জন্য কাক্সিক্ষত ফল বয়ে না-ও আনতে পারে। সে কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সময়ক্ষেপণ।

সরকার প্রশাসকদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে চায়, যেভাবে আওয়ামী সরকার করেছে; এমন ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আওয়ামী লীগের অনুসরণ বর্তমান সরকারের জন্য কোনোভাবে শুভ হবে না।

আমরা মনে করি, দলীয় প্রভাব কমাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। অনেকে নির্দলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে স্থানীয় নেতৃত্ব বিকশিত হতে পারে। জনগণ চায়, সরকার আওয়ামী লীগের অনুসরণ নয়; বরং জনগণের ইচ্ছার মূল্যায়ন করুক, গণতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা করুক। অবিলম্বে স্থানীয় সরকারেরর নির্বাচন দিয়ে তৃণমূলে গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত রাখুক।