দেশে মূল্যস্ফীতির হার আবারো ঊর্ধ্বমুখী। গত মার্চ মাসে এর হার ছিল ৮.৭১ শতাংশ। এপ্রিলে এসে দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে। এক লাফে মূল্যস্ফীতির হার এতটা বেড়ে যাওয়া, মানুষের জীবনে চরম অস্বস্তি নেমে আসার বার্তা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, খাদ্যবহির্ভূত খাতে এই হার ৯.৫৭ শতাংশে পৌঁছে গেছে। অসহনীয় হয়ে উঠেছে সাধারণ মানু০ষের জীবনযাত্রার ব্যয়। এই জাঁতাকলে শহর ও গ্রামÑ উভয় অঞ্চলের মানুষই পিষে যাচ্ছে। গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি জাতীয় হারকে ছাড়িয়ে ৯.০৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। সেখানে খাদ্যবহির্ভূত খাতে এই হার প্রায় ১০ শতাংশের (৯.৮১ শতাংশ) কাছাকাছি।
গ্রামীণ জনপদে আয়ের উৎস সীমিত। কৃষি ছাড়া অন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। যারা অন্য কাজ করেন, তাদের মজুরিও তুলনামূলক কম। সেখানে জীবনধারণের আনুষঙ্গিক ব্যয় লাগামহীন বেড়ে যাওয়ায় প্রান্তিক মানুষের সঞ্চয় ও ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে নেমে গেছে। আয়ের সঙ্কীর্ণতা আর বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপে দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রা সঙ্কটের মুখে পড়েছে।
শহরেও দিন দিন বাড়ছে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দাম। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস উঠছে। বিবিএসের তথ্যে মজুরি সূচকে সামান্য উন্নতির (৮.১৬ শতাংশ) দাবি করা হয়েছে; কিন্তু সেটি মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ আয় যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে বেশি গতিতে বাড়ছে ব্যয়। এই ঘাটতির কারণে মৌলিক চাহিদা পূরণেও হিমশিম খাচ্ছে মানুষ।
জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে অনিয়ন্ত্রিত বাজারের কারণে। আমাদের দেশে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়। পণ্য আটকে রাখা হয় গুদামে। পরে সিন্ডিকেটের প্রভাবে কিনতে হয় চড়া মূল্যে। এই সরবরাহের ক্ষেত্রে কারসাজি থাকে মধ্যস্বত্বভোগীদের। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রভাবও থাকে। যুদ্ধবিগ্রহের কারণে স্থানীয় বাজারেও মুদ্রাস্ফীতি হয়। দরিদ্রদের ক্রয়ক্ষমতা কম হলেও বৈশ্বিক এই অর্থনৈতিক টানাপড়েনের শিকার হতে হয় তাদেরও।
আমাদের দেশে বড় একটা সমস্যা হলো পরিসংখ্যানের সীমাবদ্ধতা। অর্থনীতিবিদরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বা গড় মুদ্রাস্ফীতির মতো ‘চুলচেরা পরিসংখ্যান’ দিয়ে অর্থনীতির অবস্থা বোঝাতে চান; কিন্তু এই পরিসংখ্যান অনেকসময় প্রান্তিক মানুষের আসল চিত্র তুলে ধরতে পারে না। তাই কেবল কাগজের হিসাব বা ডাটা বিশ্লেষণ করে এই জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা আরো কঠোর ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে না পারলে অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে এবং বাড়তে থাকা খাদ্যবহির্ভূত খাতের খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ জরুরি।



