দেশে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া দীর্ঘ দিনের একটি সঙ্কট ছিল। সরকারের নানা উদ্যোগে বর্তমানে সেটি অনেকটাই দূর করা গেছে; কিন্তু এখন মাধ্যমিক স্তরে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে বেশি, যা শিক্ষার নতুন সঙ্কট হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বরাতে একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীর হার যথাক্রমে ৬৯ দশমিক ৩ ও ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তর শেষ করতে পারছে না।
ইউনেস্কো প্রকাশিত (২০২২) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীর হার যথাক্রমে ৮৮, ৭১ ও ৩১ শতাংশ। প্রাথমিকে অতি দরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী ও অতি ধনী পরিবারের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক সম্পন্ন করার হার ছিল যথাক্রমে ৮২, ৮৭, ৮৮, ৯২ ও ৯৩ শতাংশ। এ স্তরে অতি দরিদ্র ও অতি ধনী পরিবারের শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারের ব্যবধান ১১ শতাংশ। নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে এ পার্থক্য বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৬ ও ৪৮ শতাংশ।
মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি। এডুকেশন ওয়াচ-২০২৩ গবেষণা প্রতিবেদন মতে, ২০২২ সালে মাধ্যমিক স্তরের একজন শিক্ষার্থীর জন্য পরিবারের বার্ষিক গড় ব্যয় ছিল ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা। মফস্বল এলাকায় এ খরচ ২২ হাজার ৯০৯ ও শহরাঞ্চলে ৩৫ হাজার ৬৬২ টাকা। ২০২৩ সালে বছরের প্রথম ছয় মাসেই এ গড় খরচ ৫১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২০ হাজার ৭১২ টাকায়।
আর শিক্ষার ব্যয় যখন বেড়ে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের ব্যয় সঙ্কুলান করতে পারে না। তারা সন্তানদের স্কুল বন্ধ করে অর্থকরী কাজে লাগিয়ে দেয়।
শিখন ঘাটতির ফলে মাধ্যমিকে ওঠার পরে অনেক শিক্ষার্থী পাঠ্যপুস্তকের পড়া বুঝতে পারে না। একই সাথে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদানে দুর্বলতার কারণেও তাদের পড়াশোনায় ঘাটতি থেকে যায়, যা পূরণ করার জন্য তাদের প্রাইভেট বা কোচিংয়ে শিক্ষার দরকার হয়; কিন্তু সেই অতিরিক্ত শিক্ষা গ্রহণের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তা অনেকেই মেটাতে পারছে না। এ কারণে তারা মাধ্যমিক স্তর থেকে ঝরে পড়ছে।
দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগ এমপিওভুক্ত। এসব এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান সরকারের সামান্য সাহায্য দিয়ে চলে। এগুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষকও খুব কম। আর দরিদ্র পরিবারের বড় অংশই এসব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্র্থী। এমতাবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণের মাধ্যমে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়াও অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করতে হবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক স্তর থেকে ঝরে পরা ঠেকাতে তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহযোগিতা চালু করা যায়। এতে যেমন তাদের পড়ালেখায় আগ্রহ বাড়বে তেমনি খুব সহজে পড়ালেখা ছেড়ে কাজে প্রবেশ বন্ধ হবে।
বিশ্বে যখন শিক্ষার জয়জয়কার চলছে তখন দরিদ্রতার কারণে বাংলাদেশের মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়বে তা হতাশাজনক। মাধ্যমিক স্তরের দরিদ্র পরিবারে সন্তানদের ঝরে পড়া রোধে একগুচ্ছ পরিকল্পনা দরকার।



