অভিভাবকশূন্য দুদকে স্থবিরতা

কমিশন দ্রুত পুনর্গঠন করুন

দুদকের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়লে শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; বরং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সুশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করুন।

চব্বিশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারে পদক্ষেপ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন)-২০২৫’ অধ্যাদেশ জারি করে তৎকালীন সরকার। তবে বাস্তবতা হলো- বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নানামুখী জটিলতায় দুদক গঠনের ধারাবাহিকতায় বারবার ছন্দপতন ঘটে। এ যাবৎকালে গঠিত দুদকের সাতটির মধ্যে চারটি কমিশনকে মেয়াদপূর্তির আগেই বিদায় নিতে হয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন-উত্তর নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় ৩ মার্চ মেয়াদপূর্তির আগেই পদত্যাগ করেন দুদক চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেনসহ দুই কমিশনার। তখন থেকে নেতৃত্বশূন্য সাংবিধানিক সংস্থাটি।

দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী, কোনো কমিশনারের পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নিয়োগ দেয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। এমনকি নতুন কমিশন গঠনের প্রাথমিক ধাপ ‘সার্চ কমিটি’ও গঠন করা হয়নি। এতে থমকে গেছে দুর্নীতির অনুসন্ধান, তদন্তসহ কয়েক হাজার মামলার কার্যক্রম।

দুদক আইন অনুযায়ী, অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, মামলা করা, আসামি গ্রেফতার, দুর্নীতিবাজদের সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা কিংবা বিদেশভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মতো প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কেবল কমিশনের। ফলে অভিভাবকহীন অবস্থায় দুদকের সব অভিযান ও আইনি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানটি কার্যত থমকে আছে। অর্থাৎÑ কমিশনের অনুপস্থিতিতে নতুন মামলা, অভিযোগপত্র, আসামি গ্রেফতার কিংবা দুর্নীতিবাজদের সম্পদ ক্রোকের মতো নীতিগত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বন্ধ আছে। ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীরা। এক দিকে আইনি জটিলতা, অন্য দিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় স্বাধীন সংস্থাটি এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

দুদক সূত্রের বরাতে নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে সৃষ্ট আইনি জটিলতা এই বিলম্বের মূল কারণ। বর্তমান সরকার ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫’ সরাসরি সংসদে অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে দুদকের ভবিষ্যৎ। সিদ্ধান্তহীনতায় থমকে আছে সার্চ কমিটি গঠন, যা চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ আরো বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

দুদক সংস্কার কমিশনের সব সুপারিশ রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে ‘জুলাই সনদে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জুলাই সনদের পাশাপাশি দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব প্রস্তাবে বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে লিখিত সমর্থন জানিয়েছে, সেগুলোর আলোকে অধ্যাদেশটি দ্রুত সংশোধন করে অবিলম্বে সংসদে আইন হিসেবে অনুমোদন করা সরকারের দায়িত্ব।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন সংস্থাটি যদি কমিশন শূন্যতায় ভোগে, কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজে দুর্নীতি বেড়ে যেতে পারে। তদন্ত বা নজরদারি দুর্বল হলে দুর্নীতিবাজরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পরিণামে জন-আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। দুদকের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হলে সরকারের প্রতি নাগরিকদের অনাস্থা তৈরি হয়, যা সামগ্রিক শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন।

দুদকের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়লে শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; বরং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সুশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করুন।