আজ পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। বছরের প্রথম দিনটি সব দেশে সব জাতি উৎসবের আমেজে উদযাপন করে। বাংলাদেশেও সর্বস্তরের মানুষ নানা আনন্দ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ বরণ করে। বৈশাখীমেলা, আনন্দ মিছিল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, হালখাতাসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বরণ করা হয় বছরের প্রথম দিনটি। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও পয়লা বৈশাখ উদযাপনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
বেশ অনেক বছর ধরে নববর্ষের আনন্দ মিছিল ঘিরে দেশে একধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চলে আসছিল। শোভাযাত্রার আয়োজনে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় আবেগে সূক্ষ্মভাবে আঘাত হানার অপচেষ্টা চলেছে প্রকাশ্যে। অশুভর বিরুদ্ধে শুভ ও মঙ্গলের আহ্বানে প্রতীকী আয়োজনে এমন সব মূর্তি ও মুখোশ উপস্থাপন করা হয়েছে যেখানে অশুভ হিসেবে স্পষ্টত দেশের বৃহত্তর জনগণের নন্দিত রাজনৈতিক নেতানেত্রী ও ধর্মীয় অনুভূতিকে সচেতনভাবে নিশানা বানানো হয়েছে। বাঙালিত্বে ফেরার নামে এটিকে চিহ্নিত একটি গোষ্ঠীর পূজার আদলে মুসলিম জাতিসদত্তার বিপরীতে দাঁড় করানোর বাসনা দেখা গেছে। কূটকৌশলে তুলে আনা হয়েছে ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতা আর সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গ।
বাংলাদেশের বেশির ভাগ ধর্মপ্রাণ মানুষ এই কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। সরাসরি বিরোধিতা না করলেও তাদের মধ্যে অলক্ষ্যে একধরনের মেরুকরণ ঘটেছে। বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চার বিরুদ্ধে তরুণ সমাজের সচেতন ও সোচ্চার হয়ে ওঠার যে প্রবণতা সম্প্রতি জোরালো হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্টত বাঙালিত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ির স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। চলতি বছরের বৈশাখী শোভাযাত্রায় সেই পুরনো অশোভন কিছু প্রশ্রয় পাবে না এটি প্রত্যাশিত।
বাংলা নববর্ষ আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা সন গণনার সূচনা করেন মোগল সম্রাট আকবর। তিনি খাজনা আদায়ের সুবিধায় বাংলা সন চালু করেন। তখন থেকে নববর্ষে ব্যবসায়ীরা সারা বছরের হিসাব-নিকাশ করেন, হালখাতা খোলেন। এ দিনে ক্রেতারা তাদের বকেয়া পরিশোধ করেন। ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করান। এতে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে একধরনের সামাজিক মিত্রতার বন্ধন গড়ে ওঠে। শত শত বছর ধরে এ ধারা চলে আসছে। আজকের দিনে গ্রামগঞ্জের মতো শহর নগরেও বাংলা নববর্ষ ঘিরে বৈশাখী অর্থনীতি বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মেলায় হস্তশিল্প, কারুপণ্যসহ নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজনে উৎসব একই সাথে আনন্দ ও আর্থিক লেনদেনের উৎস হয়ে ওঠে।
নববর্ষের দিনটিকে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাবিন্দ্রিক সংস্কৃতি প্রসারের বাহানায় তথাকথিত চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার কুশলী উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এ উৎসবকে। বাঙালি সংস্কৃতির ধারক সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট রমনার বটমূলে সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষবরণের যে ধারা শুরু করে, সেটি ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মোড়কে মূলত রাজনৈতিক কর্মসূচি। সেই ধারাবাহিকতায় আজও ধরে রেখেছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বর্তমান সময়ে এসে নববর্ষের উৎসব সবধরনের রাজনৈতিক অভিসন্ধিমুক্ত ও নির্ভেজাল আনন্দের উৎসবে পরিণত হবে এটিই কাম্য।
নববর্ষ সবার জীবনে বয়ে নিয়ে আসুক খুশির বার্তা। অতীতের তিক্ততা, গ্লানি ও ব্যর্থতা মুছে নতুন আশায় উজ্জীবিত হোক গোটা জাতি। স্বাগত ১৪৩৩।



