শাপলা গণহত্যা তদন্ত, ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় জাতি

শেখ হাসিনার শাসনের প্রথম বড় দাগের নিষ্ঠুরতা ছিল ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা গণহত্যা। ওই দিন রাতে ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’ নাম দিয়ে সামরিক কায়দায় কয়েক লাখ মানুষের ওপর নির্মমতা চালানো হয়। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিকে দিয়ে রাতের অন্ধকারে একযোগে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। ওই অভিযানে ঢাকার মানুষ রাতভর গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেডের একটানা শব্দ শুনেছেন। সকালে শাপলা চত্বর ও আশপাশ এলাকা ধুয়ে রক্তাক্ত অভিযানে হতাহতের ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়। হাসিনার দীর্ঘ অপশাসনে এ ঘটনার বিচার চাওয়া দূরের কথা, কেউ টুঁশব্দ পর্যন্ত করতে পারেননি। নতুন পরিস্থিতিতে রহস্য উন্মোচন হতে শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-আইসিটি হেফাজতের মহাসমাবেশে চালিত নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। তদন্তকারী দল জানতে পেরেছে, ওই হামলার রাতে শাপলা চত্বরে ৩২ জনকে হত্যা করা হয়। লাখো মানুষকে অস্ত্রের মুখে তাড়িয়ে রাজধানীর বাইরে সরিয়ে দেয়ার সময় আরো ২৫ জন হত্যার শিকার হন। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। সরকার ওই সময় প্রাণহানির খবর অস্বীকার করে। খোদ শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে হেফাজতের লোকদের প্রাণহানি নিয়ে ঠাট্টা করে বলেন, তারা রঙ মেখে রাস্তায় শুয়েছিল। মৃতদের নিয়ে তার এমন নিষ্ঠুর বিদ্রূপ দেশবাসীকে সেদিন চরম মানসিক আঘাত করলেও মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছিল।

যারা এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে চেয়েছেন তাদেরও শক্ত হাতে দমন করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার একে বিচারবহির্ভূত হত্যা উল্লেখ করে দোষীদের শাস্তি চাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ওপর সরকারের খড়্গ নেমে আসে। শুধু তাই নয়, সংস্থাটির প্রধান আদিলুর রহমান খানকে গুম পর্যন্ত করা হয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে কারাদণ্ড দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির অপর পরিচালক নাসির উদ্দিন এলানকেও একই আইনে কারাদণ্ড দেয়া হয়। অন্যদিকে অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ এবং র‌্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ সংশ্লিষ্ট সবাই দ্রুত পদোন্নতি পান। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার সব দুয়ার তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

গণমাধ্যমে তদন্ত অগ্রগতি নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। এ ঘটনায় হাসিনা ও তার সরকারের মন্ত্রী, সামরিক-বেসামরিক কিছু আমলা বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। রাষ্ট্রের এই দানবীয় আচরণের পেছনে গণজাগরণ মঞ্চ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। তাদের আড়ালে আরো বড় একটি চক্র সক্রিয় হয়ে তৎকালীন সরকারকে উসকানি দিয়েছে। তাদেরও শনাক্ত করতে হবে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার পেছনে শাপলা গণহত্যা শক্তি জুগিয়েছে। দমন করে শাসন কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করার কৌশলটি হাসিনা এ ঘটনা থেকে রপ্ত করেছিলেন। তাই এর সাথে জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে কোনো ধরনের গাফিলতি করা যাবে না।

লাখ লাখ মানুষের প্রতিবাদী জমায়েতকে বেআইনি শক্তি প্রয়োগে দমনের এমন নজির সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল। এর বিচার সম্পন্ন করা এখন বর্তমান সরকারের জন্য গুরুদায়িত্ব। রাষ্ট্রের ভিত মজবুতের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদের আগমন ঠেকাতে হলে এ ঘটনার ন্যায়বিচারের বিকল্প নেই। এর সাথে বিডিআর হত্যাসহ হাসিনার সময়ে সংঘটিত সবকটি বড় হত্যাকাণ্ডের বিচারও সরকারকে আন্তরিকতার সাথে করতে হবে।