সারা দেশে বিদ্যুতের ভোগান্তি বেড়েছে। বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থদের ভোগান্তির শেষ নেই। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্রশিল্প, বাণিজ্য। সহযোগী একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীতে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও গ্রামের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিভীষিকাময়। বিভিন্ন জনপদে দিন-রাত মিলিয়ে আট থেকে ১২ ঘণ্টা, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এক দিকে তাপদাহ, অন্য দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অন্ধকার- এই দুই যন্ত্রণায় গ্রামের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার খেলায় কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্পকেও ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তায়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বর্তমানে লোডশেডিং দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। জ্বালানি সঙ্কট, বিশেষ করে গ্যাস ও কয়লা স্বল্পতার কারণে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে কাক্সিক্ষত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কয়লা সঙ্কটে মাতারবাড়ী ও এসএস পাওয়ারের মতো বড় কেন্দ্রগুলো থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে এবং রামপাল কেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। তবে আপত্তিকর বিষয়টি হলো- লোড ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য। সরকারের নীতি অনুযায়ী, শহর অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে পরিকল্পিতভাবে গ্রামকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। পিরোজপুর, নাটোর, কুড়িগ্রাম কিংবা ময়মনসিংহের গ্রামাঞ্চলে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছে। এর মানে-আমাদের উন্নয়ন দর্শনে গ্রাম এখনো অবহেলিত। এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
বিদ্যুতের এই ভয়াবহ সঙ্কটের প্রভাব বহুমুখী। লোডশেডিংয়ের কারণে গভীর নলকূপগুলো সচল রাখা যাচ্ছে না, এতে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। ময়মনসিংহের মাছচাষিদের মাছের পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, পোলট্রি খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে। ক্ষুদ্রশিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ মালিকদের শ্রমিকের মজুরি গুনতে হচ্ছে ঠিকই। এর বাইরে প্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সার বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সময়মতো কাজ জমা দিতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিদ্যুতের অভাবে অনেক জায়গায় পানি সঙ্কটও তীব্র হচ্ছে। শিক্ষা ও সাধারণ জনজীবনের ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। আইপিএস বা জেনারেটর চালিয়ে যে সঙ্কট সামাল দেয়া হবে, সেই সুযোগও জ্বালানি তেল ও গ্যাসের অভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।
এই সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকারকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কয়লা ও তেলের বকেয়া বিল পরিশোধ করে কেন্দ্রগুলো সচল করা উচিত। ডলার সঙ্কটের দোহাই দিয়ে উৎপাদন সীমিত রাখা কোনো সমাধান নয়। একই সাথে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে আরো জোর দিতে হবে। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যুতের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। অন্তত সেচ ও উৎপাদনশীল খাতের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। খেয়াল রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি যেন দুর্বিষহ হয়ে না পড়ে।



