পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় বিজেপি : উদ্বেগের কারণ আছে

বাংলাদেশের সরকারকে কূটনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। মুসলমানদের মানবাধিকার রক্ষায় ভারতকে বাধ্য করতে আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নির্বাচনে জয়ী হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী হলেন শুভেন্দু অধিকারী। তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি কংগ্রেসে, তারপর তৃণমূল কংগ্রেস হয়ে সব শেষে বিজেপিতে। তিনি বাম ফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত মাওবাদীদের গোপনে অস্ত্র সরবরাহ করতেন এমন অভিযোগ ছিল রাজ্য সিআইডির। দুর্নীতি ও প্রতারণা করে সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে মামলাও হয় তার বিরুদ্ধে। নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হয়েছে সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে দিয়ে। ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লাখ ভোটারকে বাদ দেয়ার ঘটনাও বিশেষ ভূমিকা রাখে এই বিজয়ের পেছনে।

কিন্তু এসব তথ্য বাংলাদেশের জন্য মুখ্য বিবেচ্য নয়। মুখ্য হলো, পশ্চিমবঙ্গে একটি উগ্রবাদী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকার সম্ভাব্য প্রভাব। আরেক প্রতিবেশী রাজ্য আসামে বেশ কয়েক বছর ধরে বিজেপি ক্ষমতায় এবং তার বিরূপ ফল আমাদের সামলাতে হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে অনেক ভারতীয় বাংলাভাষী মুসলিমদের বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। মুসলিমদের নির্যাতন সেখানে নিত্য ঘটনা। তবে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ এক নয়। পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশীদের সম্পর্ক প্রতিদিনের। সেখানে যখন যা ঘটে তার খবর তাৎক্ষণিকভাবে এ দেশে রটে।

নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশী অভিবাসীদের অর্থাৎ বাংলায় কথা বলেন এমন মুসলমানদের ফেরত পাঠাবেন। এটি মূলত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মসূচি। কিন্তু মাত্র ক’দিন আগে এমন ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘বাংলাদেশী’ তকমা দিয়ে ঠেলে পাঠানো একজন নারী আসলে ভারতের নাগরিক। ভারত সরকার সেই নারীকে ফেরতও নিয়েছে। এ ঘটনা বলে দেয়, মূলত ভারতের বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ অর্থনৈতিকভাবে কোনো দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে নেই; বরং চব্বিশের পর বাংলাদেশীদের কলকাতায় ভ্রমণ বন্ধ হলে দেখা যায় সেখানকার ব্যবসায় ধস নেমেছে। অর্থাৎ রাজ্যটির অর্থনীতির অনেকটা বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। তাই বাংলাদেশ থেকে সেখানে অভিবাসী হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

পুশইনের সমস্যা হয়তো কূটনৈতিকভাবে সমাধানযোগ্য; কিন্তু যে সমস্যার রাষ্ট্রীয় সমাধান নেই সেটি গুরুতর। সেটি হলো, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের আশঙ্কা। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর হামলা শুরু হয়েছে। বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয়া হচ্ছে, আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ এসব দেখছে। কী প্রভাব পড়তে পারে সবার জানা।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথিত খবরে ভারতে হিন্দুদের মধ্যে যেমনটা হয়, ভারতে মুসলিমরা নিপীড়িত হলে একই প্রতিক্রিয়া হবে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে। বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অনেক আগেই এমন কথা বলেছেন মিডিয়ার সাথে সাক্ষাৎকারে।

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে সাধারণভাবে হিন্দুদের প্রতি বিদ্বেষ নেই। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যে কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ শুরু করেছে তা শঙ্কার। আমরা ভীত নই, তবে শঙ্কিত। এ দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হলে তার দায় বর্তাবে বিজেপির ওপরে।

বাংলাদেশের সরকারকে কূটনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। মুসলমানদের মানবাধিকার রক্ষায় ভারতকে বাধ্য করতে আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে।