বিস্তৃত অবৈধ গ্যাসলাইন

জানমাল রক্ষা করুন

অবৈধ গ্যাসলাইন বন্ধ করা না হলে, যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অবৈধ লাইন শনাক্ত করে স্থায়ীভাবে উপড়ে ফেলা জরুরি। এজন্য একটি স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।

ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতে মাটির নিচে জালের মতো ছড়িয়ে আছে অবৈধ গ্যাসলাইন। পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে ৯০ শতাংশ অবৈধ সংযোগ আছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তিতাস গ্যাস কোম্পানির এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের কারসাজিতে গড়ে উঠেছে এই সমান্তরাল অবৈধ গ্যাসলাইন।

এতে এক দিকে রাষ্ট্র হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব। অন্য দিকে বিপন্ন হচ্ছে মানুষের জীবন। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, গ্যাসের অতিরিক্ত অপচয় এবং অবৈধ সংযোগ ও চুরির কারণে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে রাষ্ট্রের। অন্য দিকে বিস্ফোরণে জীবন বিপন্ন হচ্ছে অনেকের। কোনো ঘটনা ঘটলে তিতাস কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। অবস্থা কত ভয়াবহ তা নারায়ণগঞ্জের তথ্য থেকেই স্পষ্ট। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের তথ্যে বলা হয়, শুধু এখানেই গত ছয় বছরে দুই শ’র বেশি গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। সর্বশেষ গত রোব ও সোমবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লাকি বাজার ও গিরিধারায় বিস্ফোরণে একই পরিবারের পাঁচজনসহ সাতজন মারা গেছেন।

কোথায় গ্যাসের চাপ বেশি এবং কোন এলাকায় নজরদারি কম, তা চিহ্নিত করা হয় অবৈধ সংযোগ দেয়ার আগে। এ জন্য তথ্য পাচার ও রুট নির্ধারণে তিতাসের অসাধু কর্মকর্তারা প্রথমে সরকারি পাইপলাইনের আসল জিও-ম্যাপিং দুষ্টচক্রের হাতে তুলে দেন। এরপর পাইপ ও সরঞ্জাম সরবরাহে অবৈধ সংযোগে ব্যবহৃত নিম্নমানের পাইপ, রাইজার এবং রেগুলেটর তিতাসের ঠিকাদারের মাধ্যমে কালোবাজারে কেনা হয়। স্থানীয় মাস্তান ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের পাহারায় মাঝরাতে রাস্তা খুঁড়ে দ্রুত লাইনের কাজ সম্পন্ন করা হয়। তিতাস কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযান চালায়, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। কিন্তু পরক্ষণেই সংশ্লিষ্ট চক্রটি আবার অবৈধ সংযোগ দেয়।

অবৈধ গ্যাসলাইনে ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল এখন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে। সরকারি লাইনে যে মানের পাইপ বা ঝালাই প্রয়োজন, অবৈধ লাইনে তার কিছু নেই। ফলে মাটির নিচে অনবরত গ্যাস নির্গত হচ্ছে। ছিদ্র দিয়ে নির্গত গ্যাস ড্রেন, সুয়ারেজ লাইন এবং ভবনের বেজমেন্টে জমা হয়। সামান্য আগুন বা বৈদ্যুতিক স্পার্কে ঘটছে ভয়াবহ সব বিস্ফোরণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মগবাজার, সায়েন্স ল্যাব, ফতুল্লা এবং নারায়ণগঞ্জের মসজিদে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের জন্য দায়ী অবৈধ লাইন ও লিকেজ।

এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় ডিজিটাল ম্যাপিং সম্পন্নের বিকল্প নেই। কারণ, এই প্রযুক্তিতে যেকোনো অবৈধ সংযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমপিউটারের মনিটরে ভেসে ওঠে। কিন্তু এই সংস্কার আটকে রাখা হয়েছে চক্রের স্বার্থে। অথচ যেকোনো গ্যাস বা বিদ্যুৎ লাইনে জিও-ম্যাপিং এখন বাধ্যতামূলক।

আমরা মনে করি, অবৈধ গ্যাসলাইন বন্ধ করা না হলে, যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অবৈধ লাইন শনাক্ত করে স্থায়ীভাবে উপড়ে ফেলা জরুরি। এজন্য একটি স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।