অরাজকতা বললে যথার্থ হবে না, এর চেয়েও জঘন্য ক্রিয়াকলাপ ঘটছে দেশের উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে। পঠন-পাঠনের চেয়ে মিছিল, মিটিং, ঘেরাও, খেদাও, শাটডাউন, কমপ্লিট শাটডাউন ইত্যাদি যেন বেশি প্রাসঙ্গিক কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষক আন্দোলনে দক্ষিণাঞ্চলের দুই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির। পদোন্নতি জটিলতা নিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) শিক্ষকদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) ভিসিবিরোধী আন্দোলনের অস্থিরতা। এ দিকে পবিপ্রবিতে উপাচার্য অপসারণ দাবিতে চলা অবস্থান কর্মসূচিতে বহিরাগতদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় শিক্ষকসহ আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতির দাবিতে চলমান ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন দফতরে তালা দেয়া হয়। সেই তালা আবার ভাঙাও হয়েছে, ভিসি মোহাম্মদ তৌফিক আলমের নেতৃত্বে।
ভিসিকে নানা বাজে শব্দে সম্বোধন করে ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা বলেছেন, তাদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে ভিসি একের পর এক অন্যায্য কাজ করেই যাচ্ছেন। নমুনা দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যান বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ। বৈঠক করেন ভিসির সাথে। পরে কথা বলতে চান আন্দোলনরত শিক্ষকদের সাথে। তারা পাত্তা দেননি। এরপরেই প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন দফতরে লাগানো তালা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন উপাচার্য। বাইরে থেকে মিস্ত্রি এনে ভিসি নিজে উপস্থিত থেকে তালা ভাঙার তদারকি করেন। এক দিকে শিক্ষকদের শাটডাউন কর্মসূচিতে ক্যাম্পাসে অচলাবস্থা। আরেক দিকে তালা ভেঙে ক্যাম্পাস চালু দেখাচ্ছে আরেক গ্রুপ। ভাবা যায় কী নিম্নমানের তামাশার গহ্বরে দেশের একটি সরকারি বা পাবলিক উচ্চ শিক্ষাপীঠ?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক অভিভাবক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসি এ ক্ষেত্রে অনেকটাই দর্শক। ইউজিসির কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে নানা প্রশ্ন। তারা কেবল নিয়মমাফিক পরিদর্শন করে। শিক্ষার মান বা শিক্ষকদের তদারকিতে নেই। ইউজিসি অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ম জারি করেই তার দায়িত্ব শেষ করছে; কিন্তু সেই নিয়মগুলো তৃণমূল পর্যায়ে মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার মতো প্রয়োজনীয় জনবল বা সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট।
অচলাবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও পরীক্ষা বন্ধ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র। আর এর মধ্যেই দেশের অন্তত ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিনে ভিসি পদে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) নতুন ভিসি হিসেবে অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানের নিয়োগ প্রজ্ঞাপন জারির মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই তা বাতিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে।
শিগগিরই আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুটেক্স) আরো অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পরিবর্তনের কানাঘুষা ব্যাপক। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের অনুমোদনক্রমে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের চার বছরের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
নতুন নিয়োগ পাওয়া ভিসিদের মধ্যে রয়েছেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিম এবং রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হয়েছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো: মামুন অর রশিদ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন। অন্য দিকে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হয়েছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্টের অধ্যাপক ও ট্রেজারার ড. আবুল হাসনাত মোহা: শামীম। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া।
চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া অনেক উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসন গঠন শুরু করে। দেশের ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আরেক আবহ। মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রায় তিন মাসে আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি ও ইউজিসি চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন ভিসির বিরুদ্ধেও গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি নতুন নিয়োগে রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিবেচনার প্রভাব নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা চলছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী দ্বন্দ্ব, ভিসি অপসারণের দাবি এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ অস্থিরতা।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির সাথে সাদা দলের শিক্ষকদের হাতাহাতি হয়েছে। শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, ভিসির নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা করা হয়। অন্য দিকে ভিসি দাবি করেন, একদল শিক্ষক তার কক্ষে গিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করেন এবং হামলা চালান। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভক্ত। রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামে ছাত্রদল। নিয়োগে অনিয়ম ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অবমাননার অভিযোগ তুলে ভিসির কার্যালয়ে তালা দেয়া হয়। পরে আন্দোলন সাময়িক স্থগিত করা হয়। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যের অভিযোগে ভিসি ও প্রোভিসির পদত্যাগের দাবি নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ায় ভিসি-প্রোভিসি ও শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সম্প্রতি প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টর পদত্যাগ করেছেন।
শিক্ষাঙ্গন উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য সচরাচর শিক্ষার্থীদের দায়ী করা হয়। এবার উল্টো। গোলমালের মূলে শিক্ষকরা। এরা শিক্ষার্থীদের কোন মানের শিক্ষা দেবেন? শিক্ষার্থীরাই বা তাদের কাছ থেকে কী শিক্ষা নেবেন? এসব প্রশ্ন সঙ্গত। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষাঙ্গনে শান্তি-শৃঙ্খলার বিকল্প নেই। বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতার মধ্যে সুষ্ঠুভাবে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা অসম্ভব। অতীতে গণ-আন্দোলনের পর প্রতিবারই স্বল্পতম সময়ের মধ্যে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে গেছে এবং লেখাপড়ায় মন দিয়েছে। এবার তার ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে। তার ওপর যোগ হয়েছে শিক্ষকদের নানা কীর্তি-কলাপ। নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই নেই। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সবখানেই একই চিত্র। দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগরেও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পতিত সরকারের সময় থেকেই একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটে চলেছে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী তো আছেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র সংবাদ শিরোনাম হয়েছে বারবার। এক সময় যত দোষ ঢালা হতো ছাত্র-রাজনীতির ওপর। শিক্ষক রাজনীতিও কদাকার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু বিদ্যার জায়গা নয়; গবেষণাসহ শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও শুদ্ধাচার নিশ্চিতের জায়গাও। সমান্তরালে দেশে উচ্চশিক্ষার প্রসারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রাসঙ্গিক। নব্বই দশকের শুরুতে যখন এ দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়, তখন এর পেছনে ছিল এক গভীর সঙ্কট নিরসনের স্বপ্ন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র আসন সঙ্কট, সেশনজট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের যে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরি হয়েছিল, তা থেকে মুক্তি পেতেই বিকল্প এই ধারার উদ্ভব। কিন্তু সেখানেও আজ এক অদ্ভুত দোলাচল। এক দিকে তাদের জাঁকজমকপূর্ণ বিজ্ঞাপনী চাকচিক্য, অন্য দিকে ভেতরে বিপুল অব্যবস্থাপনা।
ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশে বড়দের পাঠশালায় ‘কোমলমতি’ ভাবা হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের। হোক তা পাবলিক বা প্রাইভেট। এখানে ঘটনার পরম্পরায় চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনে ভিন্নতা যোগ করেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক নড়াচড়ায় যখন কিছুই টলানো যাচ্ছিল না, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক দখলের প্রত্যাঘাত, জীবনবাজি রাখা, শহীদ হওয়া ছিল ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব ঘটনা। তারাই সেই আন্দোলনের বাঁক ঘুরিয়ে দিয়েছে। এসব কারণে প্রাইভেট-শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি বাড়তি আশাবাদ তৈরি হয়। সেই আশাও এ দেড়-দুই বছরে পানসে হয়ে যাচ্ছে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট



