কিছু অর্জন ও বড় চ্যালেঞ্জ

বিএনপি সরকারের ১০০ দিন

সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সমালোচকদের প্রশ্ন- একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা বিএনপির জন্য নতুন সরকারের সুযোগ-সুবিধার সময় কত দিন স্থায়ী হতে পারে? জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তব অর্জনের ব্যবধান কি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে?

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একধরনের দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের গালিগালাজনির্ভর রাজনীতির চর্চা অনেকটাই স্তিমিত। অন্তত শাসকদল ও বিরোধীপক্ষের নেতাদের বক্তব্যে আগের মতো ব্যক্তিগত আক্রমণ ও খিস্তিখেউড়ের প্রবণতা এখন কম চোখে পড়ছে।

রাজধানীর সড়কেও এসেছে কিছু পরিবর্তন। গভীর রাত কিংবা প্রবল বর্ষণের মধ্যেও ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে যানবাহনকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ক্যামেরা চালুর ফলে ট্রাফিক আইন ভাঙলে তাৎক্ষণিক নজরদারির আওতায় পড়তে হচ্ছে চালকদের। লাল-হলুদ-সবুজ বাতির স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পর ফাঁকা রাস্তা পেলেই বেপরোয়া গতিতে ছুটে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে।

সরকারপ্রধান হিসেবেও মিতব্যয়িতার কিছু প্রতীকী বার্তা দেয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ছোট করা, সিগন্যালে অপেক্ষা করা কিংবা পথে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক আচরণে নতুন বার্তা হিসেবে দেখছেন।

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে এমন কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেও সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎ খাতে কুইক রেন্টালের নামে উৎপাদন ছাড়াই ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মন্ত্রীরা বলছেন, পূর্ববর্তী সরকার অর্থনীতি ও প্রশাসনে একধরনের ‘ধ্বংসস্তূপ’ রেখে গেছে। অর্থমন্ত্রীও জানিয়েছেন, অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।

তবে সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সমালোচকদের প্রশ্ন- একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা বিএনপির জন্য নতুন সরকারের সুযোগ-সুবিধার সময় কত দিন স্থায়ী হতে পারে? জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তব অর্জনের ব্যবধান কি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে?

বিতর্ক দিয়েই শুরু

সরকারের পথচলার শুরু থেকেই কিছু সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে আসে। সংবিধান সংস্কার ও উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো পরিষ্কার অবস্থান জানায়নি সরকার। বিএনপি বলছে, তারা জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। তবে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি- বিশেষ করে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন না করে স্থগিত করেছে বর্তমান সরকার। এর মধ্যে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ, দুর্নীতি দমন কমিশন শক্তিশালীকরণ, পুলিশ সংস্কার এবং গুম-খুনবিরোধী উদ্যোগও রয়েছে। সরকারের ভাষ্য, অধিকতর কার্যকর কাঠামো তৈরির জন্য এসব পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এতে সংস্কার প্রক্রিয়ার গতি কমে গেছে।

রাজনৈতিক ভাষা ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত তিনি প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত রয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এর ফলে রাজনৈতিক বক্তব্যে উত্তেজনার মাত্রা কিছুটা কমেছে।

সরকারপ্রধানের ব্যক্তিগত সরলতা, সীমিত আনুষ্ঠানিকতা ও জনসংযোগের চেষ্টাকে অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও দলের তৃণমূল পর্যায়ে সেই সংস্কৃতি পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে কি না- সেই প্রশ্নও রয়েছে। বিশেষ করে সরকারপ্রধানের গাড়িবহর ঘিরে অতি উৎসাহী দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণ অনেকের কাছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

ভারতনির্ভরতার পুরনো ধারণা ভাঙছে

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ভারতকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক প্রচারণা ছিল। কিন্তু সরকার গঠনের পর বিকল্প বাজার ও বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ভারতীয় ভিসা সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতির হিসাবও এখন ভারতের ব্যবসায়ী মহলে আলোচিত হচ্ছে।

সরকারের অবস্থান হলো- বাংলাদেশের স্বার্থে বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে, কোনো একক আঞ্চলিক প্রভাবের ওপর নির্ভরতা কমানো হবে।

বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি

বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি- এমন ধারণা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকঋণের চাপ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্তে প্রয়োজনীয় ফরেনসিক সক্ষমতা এখনো দুর্বল।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।

মেগা প্রকল্প ও ব্যবস্থাপনা সঙ্কট

ক্ষমতায় আসার আগে বড় মেগা প্রকল্প থেকে দূরে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছিল বিএনপি। কারণ অতীতে মেগা প্রকল্পকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ জনমনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যারেজের মতো বড় প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

একইভাবে বিমান কেনা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও সংসদে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশের অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতি নয়, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা দুর্বলতাও সঙ্কটকে বাড়িয়ে তুলছে।

ডিজেলের ঘাটতি, পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ সারি, কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি এবং মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ জন-অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। একই সাথে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। থানায় মামলা না নেয়ার অভিযোগ, চাঁদাবাজির ধরন বদলে যাওয়া এবং নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধির মতো বিষয় সরকারকে নতুন করে চাপে ফেলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব সঙ্কট মোকাবেলায় শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, দলের ভেতরেও কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন; অন্যথায় পুরনো ব্যবস্থার অচলাবস্থা ভাঙতে সরকারকে আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।