মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে চতুর্মুখী। সবার আগে সবচেয়ে বড় আঘাত আসছে অর্থনীতির ওপর। সারা বিশ্বেই পণ্যের বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিভিন্ন ধাতুসহ নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, ভেঙে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা। প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। চলতি বছর বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২৪ শতাংশ এবং অন্য সব পণের দাম গড়ে ১৬ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আভাস দেয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এমন পূর্বাভাস দিয়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব -অর্থনীতি মন্থর করতে পারে। কৃষি উৎপাদন হুমকিতে পড়বে। কৃষিপণ্য ব্যয়বহুল হবে। ফলে খাদ্য সরবরাহ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ বাড়বে। বিশ্বব্যাংক বলছে, বিশ্বের অন্তত প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় ধাক্কা লাগবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দারুণভাবে আঘাত আসবে। এসবই ঘটবে বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত বিশ্বের অংশ। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী কর্মীদের শুধু কর্মসংস্থান নয়, জীবন নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধ অবসানে যেসব আলোচনা বা উদ্যোগ চলমান আছে, তাতে খুব আশাব্যঞ্জক ফল এখনো আসেনি; কিন্তু যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে। সে জন্যই এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রস্তুতির কথা বলা হলেও আমরা ইতোমধ্যে শুধু জ্বালানি খাতে কিছু প্রস্তুতি বা ব্যবস্থাপনার দৃশ্য দেখছি। কিছু তেলবাহী জাহাজ এসে পৌঁছেছে। দেশের অভ্যন্তরে তেলের রেশনিং করা হয়েছে। ৯০ দিনের বেশি চলার মতো ডিজেল মজুদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলোÑ বিকল্প উৎস থেকে খোলা টেন্ডারে তেল সংগ্রহের উদ্যোগ। এতে জ্বালানি নিরাপত্তা আপাতত ঝুঁকিমুক্ত হতে পারে; কিন্তু যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব শুধু জ্বালানিতে পড়ছে না। সার্বিকভাবে অর্থনীতির ওপর পড়ছে, এমনকি বৈদেশিক সম্পর্কের ওপরও। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, অর্থনৈতিক অস্থিরতার সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলায় সরকার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করা এবং জনগণের আয় বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে; কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। পতিত সরকারের সময়ের ব্যাংক লুটেরাদের আবার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে চরম নেতিবাচক হবে।
নানা ধরনের কার্ড বিতরণ করে সামাজিক সুরক্ষায় কতটা সুফল পাওয়া যাচ্ছেÑ তা নিয়েও সংশয় আছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের শুরুর দিকেই সরকার কূটনীতিতে যে বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তার কুফল হয়তো দীর্ঘমেয়াদে ভুগতে হবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ধাক্কা সামাল দেয়াই এই মুহূর্তের আসল চ্যালেঞ্জ। আমদানি ও প্রবাসী আয়ে বিরূপ প্রভাব সামলে নেয়াও জরুরি। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট খাতভিত্তিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। যুদ্ধরত পক্ষগুলোর এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে এমন সম্পর্ক করতে হবে, যাতে প্রত্যক্ষ সুফল তুলে আনা যায়।
এই মুহূর্তে বৃহৎ প্রতিবেশী ছাড়াও বহির্বিশ্বের প্রভাবশালী অংশীদারদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন সবচেয়ে জরুরি। এ বিষয়ে কোনোরকম শৈথিল্য ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।



