নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে রেলপথ সবসময়ই সাধারণ মানুষের প্রথম পছন্দ। তবে এর ভাঁজে ভাঁজে জেঁকে বসা দুর্নীতির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। টিকিট কালোবাজারি কিংবা চলন্ত ট্রেনে নানা অনিয়ম অনেকটা গা-সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু এখন ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয় যাত্রীদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। রেলের এই অব্যবস্থাপনা বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য এক দুঃসহ যন্ত্রণার নাম।
গতকাল নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কমলাপুর স্টেশন থেকে কোনো কোনো ট্রেন নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা পর ছেড়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম, সিলেট বা উত্তরবঙ্গ, সব রুটের অবস্থা একই। ঢাকার বাইরে থেকে যেসব ট্রেন ছেড়ে আসছে সেগুলোও নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারছে না।
একজন যাত্রী যখন ট্রেন ধরার পরিকল্পনা করেন, তার আগে তাকে যুদ্ধ করতে হয় ঢাকার অসহনীয় জ্যামের সাথে। ব্যক্তিগত ও পেশাগত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিতে হয় তাকে। ওই যাত্রী যখন শেষ মুহূর্তে স্টেশনে উপস্থিত হন, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কিন্তু আসনে বসার পর দেখেন, সময়মতো ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে না। কত সময় দেরি করে ছাড়া হবে, সে ব্যাপারেও কোনো ধারণা দেয়া হচ্ছে না। এই ‘দেরি’র যন্ত্রণা কেবল সময়ের অপচয় নয়, চরম মানসিক নির্যাতন। ট্রেন যখন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকে, যাত্রীকে তখন কামরার ভেতরেই বন্দী থাকতে হয়। কারণ, কখন হঠাৎ ট্রেনটি হুইসেল দেবে, সেটা তার জানা থাকে না। একটু পানি কেনা বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নিচে নামারও সাহস করতে পারেন না অনেকে। এতে ট্রেনটি তাকে ফেলেই চলে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। যাত্রীর প্রতিটি সেকেন্ড কাটে উৎকণ্ঠায়। প্রযুক্তির যুগে যাত্রীদের কেন অন্ধকারে রাখা হবে?
রেলওয়ের এই অব্যবস্থাপনার পেছনে দায়ী করা হচ্ছে লাইনের জরাজীর্ণ দশা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও ভুল সিগন্যালিং ব্যবস্থাকে। এতে সামগ্রিক শিডিউল চেইন ভেঙে পড়েছে। এসব সঙ্কটের কি কোনো সমাধান নেই?
দ্রুতগতির ট্রেন চালাতে হলে জরাজীর্ণ লাইন ও স্লিপার পরিবর্তন করা প্রয়োজন। দেখা গেছে, চাহিদার তুলনায় ইঞ্জিন কম থাকায় একটি ট্রেন দেরি করে পৌঁছলে পরের ট্রিপটিও পিছিয়ে যায়। এই সঙ্কট দূর করতে নতুন ও উন্নত ইঞ্জিন যুক্ত করতে হবে।
কোনো কারণে যদি শিডিউলে বিপর্যয় ঘটেই, তখন যাত্রীদের দুঃসহ প্রতীক্ষা কমাতে ডিজিটাল ডিসপ্লে ও রিয়েল-টাইম আপডেটের ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রতিটি স্টেশনে এবং রেলওয়ের অ্যাপে ট্রেনের বর্তমান অবস্থান ও ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য সময় প্রতি ১৫ মিনিট পর পর আপডেট করতে হবে। যাতে যাত্রীদেরকে কামরায় বন্দী হয়ে থাকতে না হয়। সেইসাথে অ্যাপে রিয়েল টাইম আপডেট থাকলে ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই যাত্রীরা জেনে যাবেন- তাদের ট্রেন কত সময় দেরি হতে পারে। সে অনুযায়ী ধীরে-সুস্থে রওনা হতে পারবেন তারা।
একটি ট্রেন কেন দেরি করে ছাড়ছে কিংবা কেন যাত্রীদের সঠিক তথ্য দেয়া হচ্ছে না, এসবের জন্য স্টেশন কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি অন্তত সহনীয় পর্যায়ে থাকে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। এতে অবসান হবে ‘অনিশ্চিত অপেক্ষা’র।



