সারা দেশের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। ব্যবহারের অনুপযোগী এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা। আশার কথা হলো, এ কেন্দ্রগুলো সংস্কারে তিন হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
নয়া দিগন্তের খবর অনুযায়ী, আশির দশকে নির্মাণ করা জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর ৫৯২টি কেন্দ্রকে নতুন করে সংস্কারের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। এতে একতলা প্রতিটি কেন্দ্র সংস্কারে ব্যয় ধরা হয়েছে চার কোটি ৬১ লাখ টাকা। যতদিন নির্মাণকাজ চলবে, তখনও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে না। পাশের ইউনিয়ন পরিষদ বা ভাড়া করা স্থানে বিকল্প ব্যবস্থার পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
সাধারণত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ মসৃণ হয় না। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে সে কথা। ইতোমধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে নানা সংশয় প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা ও সীমানা বিরোধ আমাদের দেশে যেকোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের প্রধান বাধা। ভূমি নামজারি ও সীমানা নিশ্চিত না করে কাজে হাত দিলে তিন বছরের এই প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতায় থমকে যাওয়ার শঙ্কা আছে। তা ছাড়া প্রকল্পের শুরুতে পরিবেশবান্ধব সোলার প্যানেল কিংবা আধুনিক মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জরুরি উপাদানগুলো রাখা জরুরি ছিল। মনে রাখতে হবে, মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া কাজে নামলে দিনশেষে তা থেকে চূড়ান্ত ফল আসে না।
একটি কার্যকর ও আধুনিক ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র কেমন হতে পারে, তার সুনির্দিষ্ট চিত্র সামনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিত। এটি যেন কেবল ইট-পাথরের দালান হয়ে না থাকে, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ জন্য সার্বক্ষণিক সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখতে হবে, নিরাপদ চিকিৎসাবর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাও জরুরি। কেন্দ্রে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও আধুনিক ডায়াগনস্টিক সামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে। সেখানে শূন্যপদের তালিকা দীর্ঘ না করে সবসময় দক্ষ ডাক্তার, নার্স নিশ্চিত করতে হবে। রোগীদের ভোগান্তি কমাতে চালু করা যেতে পারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে যোগাযোগের টেলিমেডিসিন সেবা।
ইউনিয়ন পর্যায়ে সফলভাবে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যেতে পারলে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যচিত্রে বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। গ্রামের মানুষকে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে জেলা শহর বা রাজধানীতে যেতে হবে না। এতে প্রান্তিক মানুষের খরচ কমবে। কমে আসবে দালালদের দৌরাত্ম্য। সেই সাথে বড় বড় শহরের ওপরও চাপ কমবে। এতে সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি ফিরে আসবে।
আমরা মনে করি, যেকোনো বড় পরিবর্তনের পেছনে একটি ছোট ও সাহসী উদ্যোগ দরকার হয়। সরকারের এই উদ্যোগ স্বাস্থ্য খাতে বিশাল মহীরুহ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। এর জন্য সবার আগে দরকার- ‘সৎ ইচ্ছা’ এবং দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ মানসিকতা। অর্থবরাদ্দের সুষম ব্যবহার এবং পরিকল্পনা কমিশনের দেয়া নির্দেশনাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করা।
জনস্বার্থের এই মহাপরিকল্পনা যেন প্রকৃত অর্থে মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।



