কিশোর গ্যাং অপরাধ বাড়ছে

সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার

কিশোর অপরাধীরা মূলত রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয় পায়। রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে এ যাত্রায় নিষ্ক্রিয় করা না গেলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী যত কঠোর হোক, তাতে কাজে আসবে না। এ কিশোরদের জন্য কাউন্সেলিং দরকার। কিশোর বয়সে যাতে কেউ অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য তাদের মূল্যবোধের বিকাশ বড় প্রয়োজন। এ জন্য পরিবারের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা দরকার। পরিবারে যদি কিশোররা সঠিক শিক্ষা পায়, তাহলে অপকর্মে তারা জড়িত হবে না।

কিশোর-কিশোরীরা একটি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অংশ। কিশোরদের যেখানে সুন্দর ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার কথা- সেখানে তাদের একটি বড় অংশ মাদক, চুরি, ছিনতাই, মাস্তানি ও খুনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব যারা সম্মিলিতভাবে করছে, তাদের বলা হয় ‘কিশোর গ্যাং’। কিশোর গ্যাং রীতিমতো একটি কালচার। বাংলাদেশে দিন দিন তা বাড়ছে।

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে কিশোরদের সঙ্ঘবদ্ধ চক্র ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। গুরুতর অপরাধ করার প্রবণতাও তাদের বাড়ছে। প্রকাশ্যে খুনখারাবি করতে দ্বিধা করছে না তারা। গত রোববার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে এক কিশোর গ্যাং নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করে অপর এক কিশোর গ্যাং সদস্যরা।

পুলিশ সদর দফতরের বরাতে একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে রাজধানীসহ সারা দেশে ১২৭টি কিশোর গ্যাং ছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাজনিত আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়ে ২৩৭টি হয়। কোনো কোনো সংস্থার মতে, বর্তমানে এই সংখ্যা তিন শতাধিক। এসব গ্যাংয়ের অন্তত ৫০ হাজার সক্রিয় সদস্য বিভিন্ন অপরাধের সাথে যুক্ত। ২০২৪ সালের আগস্টের আগে রাজধানীতে তিন থেকে পাঁচ হাজার কিশোর গ্যাং সদস্য ছিল, যা বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার। এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বৃহত্তর মোহাম্মদপুর ও পল্লবীতে। এর কারণ, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন ক্যাম্প ও অর্ধশত বস্তি। ঢাকার পর কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বেশি চট্টগ্রাম মহানগরে। সেখানে অন্তত ৫৭টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। অন্য বিভাগীয় শহরেও কিশোর গ্যাং দ্রুত বাড়ছে। দেশে বর্তমানে মোট অপরাধের ৪০ শতাংশের সাথে কিশোর অপরাধীরা জড়িত।

দেশে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কাজের জন্য যেমন মানুষ শহরে আসছে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুত হয়েও অনেকে শহরমুখী হচ্ছে। শহরে এসে বাসা বাঁধা অনেক অসচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারের সন্তান এসব কিশোর অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।

এই কিশোর অপরাধীদের সমর্থনে ছায়া হয়ে দাঁড়ায় তাদের তথাকথিত কিছু ‘বড় ভাই’। এরা মূলত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা। এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখার জন্য তারা কিশোরদের ব্যবহার করে। অনেকসময় পুলিশ তাদের গ্রেফতারও করে। কিশোর গ্যাং বন্ধে সরকার স্থায়ী পদক্ষেপ নেয় না।

এই সমস্যা মোকাবেলায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কিশোর অপরাধীরা মূলত রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয় পায়। রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে এ যাত্রায় নিষ্ক্রিয় করা না গেলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী যত কঠোর হোক, তাতে কাজে আসবে না। এ কিশোরদের জন্য কাউন্সেলিং দরকার। কিশোর বয়সে যাতে কেউ অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য তাদের মূল্যবোধের বিকাশ বড় প্রয়োজন। এ জন্য পরিবারের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা দরকার। পরিবারে যদি কিশোররা সঠিক শিক্ষা পায়, তাহলে অপকর্মে তারা জড়িত হবে না। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ থেকে কিশোর গ্যাং কালচার নির্মূল করা যায়। সে লক্ষ্যে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।