একের পর এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড

সামাজিক অস্থিরতা থামাতে হবে

সমাজ থেকে এসব ভয়ানক খুনাখুনি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরির প্রতি মনোযোগী হতে হবে। আর এটি করা সম্ভব রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ও সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে। এ জন্য ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা জাগ্রত করতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। বেকারত্ব কমিয়ে আনতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। এ বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

দেশে পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সম্প্রতি যেসব লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে সেগুলো নিয়ে আর নীরব থাকার সুযোগ নেই। এসব হত্যাকাণ্ড বন্ধে এখনই সোচ্চার হতে হবে। নিতে হবে নানা উদ্যোগ।

মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রীকে গলা কেটে হত্যা করে প্রতিবেশী এক যুবক। একই দিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার একটি বাসা থেকে গৃহশিক্ষিকার বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ১৪ মে রাজধানীর মান্ডায় পরকীয়ার জেরে এক সৌদি প্রবাসীকে হত্যা করে লাশ আট টুকরো করা হয়। গত ১২ মে শরীয়তপুরে এক স্ত্রী তার স্বামীকে হত্যার পর টুকরো টুকরো করে ফ্রিজে রাখতে গিয়ে আটক হন। এর আগে গত ৮ মে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক ব্যক্তি তার তিন সন্তান, স্ত্রী ও শ্যালকসহ পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার পর নিজেও পদ্মা নদীতে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

পুলিশ সদর দফতরের বরাতে বুধবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১০টির মতো খুনের ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে এক হাজার ১৪২টি। ২০২৫ সালে সারা দেশে খুন ও নৃশংস হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে তিন হাজার ৭৮৬টি, যা ২০২৪ সালে ছিল তিন হাজার ৪৪২ ও ২০২৩ সালে হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছিল তিন হাজার ২৩টি। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছে ২৮৮টি, মার্চে ৩১৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ ও জানুয়ারিতে ২৮৭টি। ঢাকা মহানগরী এলাকায় গত চার মাসে ৭৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটে।

যেসব পরিবারে ঘটনাগুলো ঘটছে ঘটনার পর তারা নিজেরাও অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ছেন। কিভাবে এ থেকে মুক্তি মিলবে তার কোনো দিশা পাচ্ছেন না!

পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় পারিবারিক বন্ধন দিন দিন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। সমাজে একজনের সাথে অন্যজনের সম্পর্ক রাখা না রাখা অনেকটা স্বেচ্ছাধীন। ফলে একে অপরের প্রতি যে সামাজিক দায়িত্ববোধ রয়েছে আজ তা আর কেউ মনে রাখতে চায় না। এটি মানুষের মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড খুব অনায়াসেই ঘটছে।

সমাজ থেকে মূল্যবোধ অনেকটাই নির্বাসিত। পরিবারের কর্তার মধ্যে যেমন মূল্যবোধ নেই, তেমনি তার অনুগতরাও মূল্যবোধহীন হয়েই বেড়ে উঠছে। আর মানুষের মূল্যবোধহীন এই বেড়ে ওঠা তাকে অনেক সময় পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট করে তুলছে। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মাদক পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটাচ্ছে। এর সাথে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান, নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক, অন্যায়-অবিচার এক শ্রেণীর মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।

সমাজ থেকে এসব ভয়ানক খুনাখুনি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরির প্রতি মনোযোগী হতে হবে। আর এটি করা সম্ভব রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ও সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে। এ জন্য ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা জাগ্রত করতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। বেকারত্ব কমিয়ে আনতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। এ বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।