বাজেট গণমানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে দাম বাড়ার একটি উপলক্ষ হিসেবে। বছরের মাঝামাঝি বাজারে পণ্যের দাম যখন বেড়ে যায় সেটি হচ্ছে সংসদে বাজেট পেশের মৌসুম। এবার বাজেট পেশের আগে পণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ ছিল না। বৈশ্বিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ নাজুক অর্থনীতি আর উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে আগেই বাজার চড়া। ক্রমাগত বাজেটের আকার বাড়ছে। গত দেড় দশকে এটি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বেড়েছে। সেই তুলনায় সাধারণের জীবনমান বাড়েনি; কিন্তু কিছু মানুষের পোয়াবারো হয়েছে। এবার সম্পূর্ণ নতুন এক প্রেক্ষিতে বাজেট ঘোষিত হয়েছে। এবারো আকার বেড়েছে। তবে বড় বাজেট সত্যিকার অর্থে জনজীবনে গুণগত পরিবর্তন আনে কি না তা নিয়ে সন্দেহ ও দ্বিধা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার আয়ের আশা করলেও বাজেট ঘাটতি থাকছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল ঘাটতি কিভাবে পূরণ হবে তার নিশ্চয়তা নেই। দুই যুগ পরে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সবার আশা পূরণ করতে চাচ্ছে। সে কারণে নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবর্তিত আকারে ফিরে এসেছে বাজেটে। সবক্ষেত্রে ইতিবাচক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেটের বিশাল আকারের পেছনে জনতুষ্টিবাদী নীতি কাজ করেছে। বাস্তবতার সাথে এর মিল কতটুকু হবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান। এক নজরে দেখে বোঝা যাচ্ছে লক্ষ্য অনেক, তবে বাস্তবায়নের কার্যকর কৌশলের অভাব স্পষ্ট।
বাজেটের আকার দেখে বাংলাদেশকে শক্তিশালী একটি অর্থনীতির দেশ মনে হবে। বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচের খাত দেখলে নিশ্চিত করে বোঝা যাবে মাথাভারী একটি সরকারি প্রশাসন দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেখানে পুরো জাতি ঋণের পাহাড়ের ভারে ন্যুব্জ। জনগণের উন্নত জীবনমান এখনো বহুদূরে। বাজেটের মোট অর্থের সবচেয়ে বড় অংশটি ২০ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হবে দেশী-বিদেশী ঋণ পরিশোধে। ২০ দশমিক ০১ অংশ খরচ হবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতনভাতা ও পেনশন বাবদ। ৪০ শতাংশের বেশি অর্থ খরচ হয়ে যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। যদিও বেশি বেতনভাতা দিয়ে সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি কমানো ও দক্ষতা বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে সরকার। বাস্তবে এমন না ঘটার শঙ্কা বেশি।
বাজেটে বিলাসদ্রব্য ও ক্ষতিকর পণ্যে অধিকহারে কর বসানো হয়েছে। যদিও নিম্নস্তরের সিগারেটের ওপর কম কর বসানো হয়েছে, যা ধূমপানের বিস্তৃতি ঘটাবে বলে সামাজিক সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে। নিত্যপণ্যে কর শুল্ক কমানো প্রবণতা লক্ষণীয়। সামাজিক সুরক্ষা বলয় বাড়ানো, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত ও কৃষকের সাহায্যের প্রতি নজর দেয়া হয়েছে। সাড়ে ৪২ লাখ কৃষক, কৃষক কার্ড পাবেন, ৪১ লাখ পরিবার পাবে ফ্যামিলি কার্ড। এ ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রাণ প্রকৃতি রক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার ওপর বাজটে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
বজেট বরাদ্দের বেশির ভাগ খাত নিঃসন্দেহ দেশবাসীকে স্বস্তি দেবে। সন্দেহ ও দ্বিধার জায়গাটি পুরনো ব্যবস্থাপনা। দুর্নীতিবাজ অদক্ষ প্রশাসন বরাবর জনগণের ভাগ্য বদলে আন্তরিকতা দেখায়নি। এই বাজেট কিছু মাত্রায় সফল করা গেলেও জাতি উপকৃত হবে। সে জন্য সরকারকে সচেতন থাকতে হবে। বছরের শুরুতে এর বাস্তবায়ন যেন পুরোদমে শুরু হয়। সব কাজ যেন সময়মতো সম্পন্ন হয় সে দিকে নজর রাখতে হবে।



