১৯৭২ সাল থেকে শেখ হাসিনার সময় পর্যন্ত দেশে সাতটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। অধিকাংশ কমিশনের ‘ঘোষিত’ লক্ষ্য ছিল, নানা নিরীক্ষা ও সংস্কারের মাধ্যমে সুশিক্ষিত মানবসম্পদ গড়ে তোলা। গালভরা আরো অনেক বয়ান ছিল। দক্ষ জনবল সৃষ্টি, ছাত্রসমাজের কাছে চলমান বিশ্বব্যবস্থা তুলে ধরা, মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকে তুলে ধরা। ন্যায়-অন্যায়কে পৃথক করার বোধ তৈরি করা, মানবিক মূল্যবোধের ধারণা প্রতিষ্ঠা দেয়া ইত্যাদি অনেক কথা। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, সাত কমিশনের অধিকাংশের শৈলী ছিল বায়বীয়। ছিল ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক চেতনা তরুণ প্রজন্মের মন-মস্তিষ্কে গেঁথে দেয়ার চেষ্টা। অধিকাংশ কমিশনই ছিল শিক্ষার ছদ্মাবরণে একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্ত মাত্র। ফলে সব কমিশন-রিপোর্ট ব্যর্থ হয়েছে। তাতে রাষ্ট্রের অর্থ ও সময় অপচয় হয়েছে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত করেছে। এতে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজন পূরণে ব্যাপক ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। ফলে সৃষ্টি হয় ‘সার্টিফিকেটধারী’ বোধ বিবেচনাহীন অসংখ্য বেকার। বাড়ছে প্রাইমারি লেভেলে ড্রপ আউট। ফলে সমাজে বাড়ছে হতাশা। হতোদ্যম যুবশক্তি দেখছে গভীর এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য। দীর্ঘ ৫২-৫৩ বছরব্যাপী চলছে অবিচ্ছিন্ন এমনই এক ধারা। সরকার আসে, সরকার যায়। নতুন করে আবার শিক্ষা কমিশন তৈরি হয়। কমিশন গঠন যেন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল। বিগত দিনে দেশের সব নৃপতি শিক্ষা নিয়ে, রোম নৃপতির মতোই কেবল মোহন বাঁশি বাজিয়েছে। হেমিলনের বাঁশির সুরে দেওয়ানা হয়ে হতাশ তরুণরা নদীতে, সাগরে ঝাঁপ দিতে কসুর করেনি। তাতেও সমাজপতিদের ধ্যান ভাঙেনি। তারা ভুলেই গিয়েছিলেন, ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’। গ্রিক মনীষী সক্রেটিসের ভাষায় শিক্ষা হলো, মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ। এরিস্টটল শিক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন (ম্যানস সেনা করপোরে সেনো) তৈরি করাই হচ্ছে শিক্ষা। ৫২ বছরে দেশের মানুষের অসুস্থতার প্রশ্নে কোনো নৃপতির কখনো মনোকষ্ট ছিল না।
বিশ্বে এখন বিদ্যাবুদ্ধিজনিত প্রযুক্তির যুদ্ধ চলমান। এই যুদ্ধের এক দিকে একক পরাশক্তি আমেরিকা আরেক দিকে আক্রান্ত ইরান। জনবলে সমৃদ্ধ প্রথম পক্ষ, আক্রান্ত ইরানের লোকবল স্বল্প। তবে ইরানের জনসংখ্যার ৯২ শতাংশ শিক্ষিত এবং বিজ্ঞানমনস্ক। এটাই প্রকৃত পরিসংখ্যান। সে কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ চলছে সমানে সমান। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। ‘কথিত’ শিক্ষার হার ৫০ শতাংশের নিচে। যাদের কেবল অক্ষরজ্ঞান আছে, তারাও এখানে অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আসল সত্যটা কী! তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও পরিবেশবিজ্ঞানের সমৃদ্ধি বাংলাদেশে একেবারেই দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রয়োজনীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো যোজন যোজন পথ পিছিয়ে। বাংলাদেশে শিক্ষাশেষে প্রতিটি তরুণ কেবল একটি ‘চাকরির’ স্বপ্ন দেখে। মুক্ত স্বাধীন চিন্তার সাথে তরুণদের এখনো পরিচিত করে তুলতে পারিনি আমরা। কিন্তু এর মধ্যেও যারা এই গণ্ডি ভেঙেছে, সাহসের সাথে চ্যালেঞ্জ নিয়েছে, নতুন পথে চলতে চেয়েছে সেসব দৃঢ়চিত্ত তরুণ কেউ চাকরি করেনি; বরং তারাই অন্যদের চাকরি দিচ্ছে। তাদের পথচলা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এখানে নিয়ম-নীতি নয়, অনিয়মই নীতি নিয়ম। সহযোগিতা সহজলভ্য নয়, নগদ মূল্যে কিনতে হয়। ঘাটে ঘাটে নাজরানা গুনতে হয়। যারা নগদের বিনিময়ে ‘সহযোগিতা’ করে তারাও শুধু শিক্ষিত নয়, উচ্চ শিক্ষিত। যেখান থেকে তারা ডিগ্রি নিয়েছে, সেখানে মর্যাল এথিক্স পড়ানো হয়নি। তবে বিনিয়োগ নিয়ে নানা গালগল্প প্রায়ই কানে আসে। দেশী ছোট-বড় বিনিয়োগ নিয়ে নাকি কর্তৃপক্ষের ‘আপাতত’ ভেবে দেখার সময়ও নেই। তার উৎসাহ বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে। বিদেশীরা আবার খোঁজখবর নেয় এ দেশে, দেশী বিনিয়োগ বারবার অর্থহীন হচ্ছে কেন? বিদেশীরা ‘হাফ এডুকেটেড’ নয়? একটি ভাত টিপেই সব টের পেয়ে যায়। ফলে ফিরতি ফ্লাইটেই দেশে ফিরে যায়।
বাংলাদেশে শত শত শিল্প-কারখানা বন্ধ হলো কেন। এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর কারো কাছে নেই। মেঘলা আকাশে এখন ‘ফানুস’ উড়িয়ে লাভটা কোথায়!
দেশের বিশিষ্টজনদের অনেকেই সময়ের প্রয়োজনে শিক্ষাক্রমের ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও, তাদের একটি প্রশ্ন আছে। শিক্ষার মৌলিক কাঠামো বারবার পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় কেন, আর উদ্দেশ্যটা কী! শিক্ষা তো সর্বকালের জন্য এক ও অভিন্ন। যেমন সুনীতি কখনো কোথাও দুর্নীতি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয় না। অথচ সাত কমিশনের প্রতিবেদনে অন্তত কয়েকবার নীতি প্রশ্নে খোলনলচে বদলে ফেলার প্রয়াস লক্ষ করা গেছে। কারো পক্ষেই এমন পদক্ষেপ নির্দোষ বলে গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষা নিয়ে এমন বারবার পরিবর্তনের লক্ষ্যটা হয়তো নিজস্ব চেতনার স্বার্থে। সেখানে শিক্ষার মৌলিক ধারণা হয়তো উপেক্ষিত থাকছে। কোনো দলবিশেষের প্রয়োজনে নয়, জাতির বৃহত্তর প্রয়োজনটাই শিক্ষা কার্যক্রমে প্রাধান্য পাওয়ার কথা; কিন্তু বাংলাদেশে সেটি উপেক্ষিত।
এ দিকে বারবার শোনা গেছে, বন্ধ শিল্প-কারখানা দ্রুত চালু করা হবে। কথাটা শুনতে চমৎকার। নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। বহু বেকারের অভিশপ্ত জীবনের অবসান ঘটবে। দেশজ পণ্যের উৎপাদন বাড়বে, আমদানি কমবে। অর্থনীতি পরিপুষ্ট হবে। তবে তার আগে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। শতশত কল-কারখানা বন্ধ হলো কেন? এর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেয়া দরকার। অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে অন্যতম কারণ হয়তো এটাই, ‘ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন’। অর্থাৎ দক্ষ কারিগরের অভাব যথেষ্ট। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বলা হয়েছে ডিগ্রিধারী বেকার। মেধা না থাকলেও সবাইকে গড়ে মহা ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি খয়রাত করতে হবে। এই মেধাহীন খয়রাতি ডিগ্রিধারীরাই শ্রমবাজারে ফালতু জনশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। দেশে শতাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেখান থেকে প্রতি বছর কয়েক লাখ ছাত্র শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। আর এদের পেছনে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে; কিন্তু তার আউটপুট কোথায়? অথচ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যথাযথ আউটপুটই সবচেয়ে জরুরি। যদি বাংলাদেশজুড়ে কারিগরি শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেয়া হতো তবে দেশে-বিদেশে দক্ষ শ্রমশক্তি নিয়োগ করা সম্ভব ছিল। দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন না ঘটলে, শিক্ষাকে সার্থক করা, দিবাস্বপ্ন হয়েই থাকবে।
শেষ করার আগে এ কথা জোর দিয়ে বলতে চাই, বাস্তবমুখী দক্ষতাভিত্তিক এবং কর্মসংস্থানের চাহিদানুযায়ী আমাদের শিক্ষা সম্পর্কিত ধারণার সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। উচ্চপর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমে গবেষণাকে অন্তর্ভুক্তকরণ অতি আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে সব সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে। শিক্ষা খাতকে দলীয়করণ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রধান শর্ত। প্রতিষ্ঠানগুলোয় রাজনৈতিক প্রভাববলয় বিস্তারের জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের নিয়ে রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তিকে উৎসাহিত করা হয়। এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রবল। শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ও সৃজনশীলতা ধ্বংস হয়। বিগত আওয়ামী জমানায় উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় দলীয়করণের কারণে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হলে নানা অপসংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে। কোথাও কোথাও ছাত্রদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে মেধার পরিবর্তে ক্ষমতাসীন দলের অনুগত মেধাহীনদের বেছে নেয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার মান দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে এখন বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নেই। এটা চরম লজ্জার।
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



