চাঁদাবাজির সেই পুরনো চিত্র

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গলদ

মূল জায়গায় হাত না দিয়ে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। মাদক দমনেও এ ধরনের বহু অভিযান দেখা গেছে। এগুলোতে বহু লোকের প্রাণও গেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। চাঁদাবাজি বন্ধে মূলত রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার দরকার। সরকারকে আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এ সংস্কৃতি পরিবর্তন করবে কি না। তার পরেই কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান কাজে আসতে পারে।

চাঁদাবাজি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার একটি বড় গলদ। এমন কোনো খাত নেই, যেখানে চাঁদা দিতে হয় না। যেকোনো ব্যবসা শুরু করতে গেলে প্রথমে নির্দিষ্ট একটি অঙ্কের অর্থ চাঁদাবাজদের দিতে হবে। হাট, বাজার, বাস-টেম্পো স্টেশন, নৌবন্দর সব জায়গায় চাঁদাবাজির দুষ্টচক্র জেঁকে বসেছে। কেউ যদি একটি বাড়ি নির্মাণ করতে যান, তাকেও চাঁদাবাজ চক্রকে অর্থ দিতে হয়। এ অবস্থা থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি নেই। জুলাই বিপ্লবের পর মানুষ এই চক্রের কাছ থেকে মুক্তির আশা করলেও এখনো দেশ সেই পুরনো চাঁদাবাজদের কাছে অসহায় হয়ে আছে।

এবার চাঁদাবাজদের হুমকিতে পড়েছেন মানবিক ডাক্তার কামরুল ইসলাম। ইউরোলজির এই চিকিৎসক কিডনি প্রতিস্থাপনে দেশে অস্ত্রোপচারে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছেন। তিনি মূলত দরিদ্র-অভাবী রোগীদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিয়ে গণমানুষের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন, যার বেশির ভাগ বিনা পয়সায়, কিছু নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে। মানবসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। তিনি গড়ে তুলেছেন কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল। রাজধানীর শ্যামলীতে প্রতিষ্ঠিত তার হাসপাতালে গিয়ে এবার চাঁদা দাবি করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একটি অঙ্গসংগঠনের নামে তার কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। যদিও সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা কামরুল ইসলামের সাথে দেখা করে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কত গভীরে প্রবেশ করেছে চাঁদাবাজি তার ভয়াবহ নমুনা, মানবিক ডাক্তারের কাছে চাঁদা দাবির ঘটনা। হাসিনার ফ্যাসিবাদী জমানায় চাঁদাবাজির প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ঘটে। অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সব খাত এর আওতায় নিয়ে আসা হয়। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকেও অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছিল। সরকারের একেবারে শীর্ষ পর্যায় থেকে এর নিয়ন্ত্রণ হতো। চাঁদার ভাগ কে কত পাবেন তা-ও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। চাঁদাবাজির শৃঙ্খলে সাধারণ মানুষকে তখন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হয়। হাসিনা সরকারের পতনে পুরনো চক্র ভেঙে গেলেও সাথে সাথে নতুন চক্র নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ডাক্তারের চেম্বারে চাঁদাবাজির আগ্রাসন পৌঁছে যাওয়া বলে দেয় দেশে ভয়াবহ এ অপসংস্কৃতির শেকড় কত গভীরে প্রোথিত। কামরুল ইসলামের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগের পর র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংস্থাটি সারা দেশে চাঁদাবাজদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। যাদের বিরুদ্ধে অচিরে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। সন্ত্রাস চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে। এমনকি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বহু অভিযান চালানো হয়েছে। এ নিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি।

মূল জায়গায় হাত না দিয়ে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। মাদক দমনেও এ ধরনের বহু অভিযান দেখা গেছে। এগুলোতে বহু লোকের প্রাণও গেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। চাঁদাবাজি বন্ধে মূলত রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার দরকার। সরকারকে আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এ সংস্কৃতি পরিবর্তন করবে কি না। তার পরেই কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান কাজে আসতে পারে।