পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ

বিদ্যুৎ খাতে মাইলফলক

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কতটা দক্ষতার সাথে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। উন্নয়নের পথে এগোতে হলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, নিরাপদ ও টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য।

পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের চূড়ান্ত ধাপে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার থেকে। এর ফলে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হলো বাংলাদেশ। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।

আমাদের জ্বালানি মূলত আমদানিনির্ভর। ৬৫ শতাংশ জোগান আসে আমদানির মাধ্যমে। বৈশ্বিক কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হয়। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধে আমরা জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলা করছি। এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও জ্বালানি নিয়ে ভুগতে হয়েছে। তাই একটি টেকসই জ্বালানি সরবরাহ আমাদের জন্য এখন জরুরি। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের যাত্রা শুরু দেশের জন্য মাইলফলক।

শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং জীবনমানের উন্নতির সাথে সাথে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চমূল্য পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি সমাধান হতে পারে। রূপপুরে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎচাহিদার ১০-১২ শতাংশ পূরণ করবে। এর অর্থনৈতিক মূল্য অনেক।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি উৎস। গ্যাস বা কয়লার মতো জ্বালানির সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল নয়। এ ছাড়া অল্প জ্বালানি দিয়ে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ফলে আমদানিনির্ভরতা কমবে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কিছুটা হলেও লাঘব হবে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত সুবিধা। একই সাথে পারমাণবিক বিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। জীবাশ্ম জ্বালানির মতো কার্বন নিঃসরণ না থাকায় এটি পরিবেশের সরাসরি ক্ষতি করে না। বৈশ্বিকভাবে যখন নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ছে, তখন পারমাণবিক শক্তি একটি বাস্তবসম্মত ‘ব্রিজ টেকনোলজি’ হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে আশার পাশাপাশি উদ্বেগও কম নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিরাপত্তা নিয়ে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা বিরল হলেও এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে; যার নজির চেরনোবিল এবং ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনা। তাই রূপপুর প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা দেশীয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। এতে এমন কোনো দেশের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া যাবে না, যারা বাংলাদেশের জন্য শতভাগ বিশ্বস্ত নয়।

প্রকল্পটি রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেয়। তবু প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবসম্পদ, রেগুলেটরি কাঠামো এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি একটি সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ববোধের প্রশ্ন।

ব্যবহৃত পারমাণবিক বর্জ্য দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ জন্য নিরাপদ সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে; এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জন-আস্থা তৈরি করা দরকার।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কতটা দক্ষতার সাথে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। উন্নয়নের পথে এগোতে হলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, নিরাপদ ও টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য।