নদী, ফসলি জমি আর জনপদ এখন মুনাফালোভী বালুখেকোদের কারণে বিপন্ন। বেপরোয়া বালু লুটে এখন আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি হুমকিতে। গতকাল নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদারীপুরের কালকিনিতে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনে ফাসিয়াতলা-লক্ষ্মীপুর-পখিরা সড়কের প্রায় ৫০০ মিটার ধসে গেছে। এতে ১০ গ্রামের মানুষের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। সাত কিলোমিটার ঘুরে তাদের যেতে হচ্ছে বিকল্প পথ ধরে। ভুগতে হচ্ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও রোগীদের।
সহযোগী একটি দৈনিক পত্রিকার খবরে উঠে এসেছে সিলেটের জাফলং ও জৈন্তাপুর এলাকার ভয়াবহ চিত্র। সেখানে ড্রেজার ও পেলোডার দিয়ে দিন-রাত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে চা বাগানের খেলার মাঠ, বসতভিটা ও শত শত বিঘা ফসলি জমি বিলীন হওয়ার পথে। এমনকি শর্ত না মেনে ইজারাধীন নদী থেকেও বালু তোলা হচ্ছে। এতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ও কবরস্থান হুমকির মুখে পড়েছে। এ দু’টি চিত্র বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি এখন বাংলাদেশের এক সাধারণ ও অসহনীয় ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
সারা দেশে এমন ক্ষমতাধর অসাধু চক্র সক্রিয়। এরা প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে, কখনো প্রশাসনের যোগসাজশে পরিবেশের ক্ষতি করছে। মাদারীপুরে বালু উত্তোলনের কারণে রাস্তা ধসে জনজীবন অতিষ্ঠ হলেও সংস্কারের ক্ষেত্রে এলজিইডি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। এক সংস্থা অন্য সংস্থার চিঠির অপেক্ষায় থাকছে। এর অনিবার্য ফল হিসেবে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সিলেটে গত এক যুগে বালুখেকোদের বিরুদ্ধে ২৫-৩০টি মামলা হয়েছে; কিন্তু বারবার এরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলে মারধর ও মামলা প্রত্যাহারের চাপ দেয়া হচ্ছে। প্রভাবশালীরা ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ নিয়ে বেপরোয়াভাবে বালু তুলছে। প্রচলিত আইন ও এর প্রয়োগ বালুদস্যুদের রুখতে কার্যকর হচ্ছে না।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে এক দিকে নদী ভাঙন হচ্ছে অন্য দিকে বাস্তুসংস্থান ও ভূগর্ভের পানির স্তরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণে সরকারকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিতে হবে। বালুমহাল ইজারা দেয়ার ক্ষেত্রে কেবল রাজস্ব আয় গুরুত্ব না দিয়ে পরিবেশগত ঝুঁকিমূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। ইজারাগ্রহীতারা নিয়ম মানছে কি না, সেটি তদারকির জন্য প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। যারা অবৈধভাবে বালু তুলছেন, তাদের কেবল জরিমানা করে ছেড়ে দিলে চলবে না, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সেই সাথে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ও বিচ্ছিন্ন করা জরুরি। স্থানীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তারা যেন দায় এড়ানোর সুযোগ না পান।
তবে মাদারীপুর ও সিলেটের সঙ্কট নিরসনে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও বাঁধ সংস্কার করতে হবে দ্রুত সময়ের মধ্যে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। এ সত্য সামনে রেখে দেশের প্রতিটি নদী ও জনপদকে বালুখেকোদের থেকে মুক্ত করা সময়ের দাবি।



