জুলাই বিপ্লবের আইকন আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। তার ওপর গুলিবর্ষণকারী দুই পুলিশের মৃত্যুদণ্ডসহ আরো ২৮ জনকে বিভিন্ন দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা শাসনে বিরোধীদের বিচার পাওয়ার সবধরনের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। রাজনৈতিক বিরোধীদের হত্যা, গুমসহ অত্যাচার-নিপীড়ন একধরনের বৈধতা পেয়েছিল। বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দেয়া আবু সাঈদের হত্যাকারীরা মনে করেছিল- হাসিনা রেজিম টিকে থাকবে। হাসিনার পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে পুরস্কার বাগিয়ে নেবে তারা। এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণ হলো- নিপীড়ক স্বৈরাচারীরা চিরদিন টিকে থাকে না। একসময় তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।
দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আবু সাঈদের ছবিটি সারা বিশ্বের প্রতিবাদীদের উৎসাহের প্রতীক হয়ে গেছে। এরপরে এই উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটা রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তরুণরা এই সাহসী অবস্থানকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বিশ্বের কোটি কোটি তরুণের কাছে তিনি এখন হিরো। রায় ঘোষণার সময় আদালত বলেন, তিনি দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন, ভেবেছিলেন তার সামনে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তারা তাকে মারবে না; কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি মানুষগুলো অমানুষ হয়ে গিয়েছিল।
শাস্তিপ্রাপ্তদের তালিকা বিচার-বিশ্লেষণ করলে একদল অমানুষের চিত্রই আমরা পাবো। শাসন টিকিয়ে রাখতে হাসিনা রেজিম সত্যিকার অর্থে একদল অমানুষ তৈরি করেছিল। বাহ্যিকভাবে এরা কেউ পুলিশ, ছাত্রলীগ, শিক্ষক কার্যত তারা সবধরনের মানবীয় গুণ হারিয়ে ফেলেছিল। রংপুরে পুলিশের তৎকালীন শীর্ষ আদেশদাতারা এবং মাঠে যারা বাস্তবায়ন করেছে তারা বেপরোয়া ছিল। সামান্য দূরত্ব থেকে সরাসরি আবু সাঈদের বুকে গুলি চালায়। এরপর ছাত্রলীগ, শিক্ষক এবং চিকিৎসকরা মিলে হত্যাকাণ্ডের মিথ্যা বয়ান তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
ওই সময়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিজের ছাত্রের পক্ষে দাঁড়ানোর পরিবর্তে হাসিনা রেজিমের পক্ষে অবস্থান নেন। পলাতক এই সাবেক ভিসিকে আদালত ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। এই কাজে তার সহযোগী হয়েছিলেন আরো কয়েকজন শিক্ষক। রেজিস্ট্রার প্রক্টরসহ বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক বিভিন্ন মেয়াদে তাই সশ্রম কারাদণ্ড পেয়েছেন। ছাত্রলীগ আগে থেকে আন্দোলন দমনে পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগী হয়ে নির্মম অবস্থান গ্রহণ করে। পুলিশসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই সময় একটি অসাধু চক্র হয়ে হত্যার ঘটনার পক্ষে কাজ করেছে।
আবু সাঈদের পিতা এই রায়ে সন্তুষ্ট হননি। তারা জানান, বিশেষ করে পুলিশের আদেশদানকারী শীর্ষ কর্মকর্তা এবং ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতিকে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হয়নি। এ অবস্থায় আসামিদের আইনজীবী জানাচ্ছেন, তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। সরকারপক্ষের আইনজীবীকেও এই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তির মুখোমুখি করতে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। অনেকসময় সরকারপক্ষের আইনজীবীদের গাফিলতির কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় কিংবা গুরুদণ্ডের বদলে লঘুদণ্ড হয়।
জুলাইতে হাসিনা ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা বৃহত্তর পরিসরে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠন করেছেন। জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনে তা বিস্তারিত উঠে এসেছে। এসব অপরাধের সুষ্ঠু বিচার না হলে এই রাষ্ট্র কখনো শক্ত পাটাতনের ওপর দাঁড়াতে পারবে না। এখনো হসিনাসহ প্রধান অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা যায়নি। সরকারকে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।



