শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা পাঠ্যবইয়ের ঘ্রাণ; কিন্তু ঝিনাইদহের গিলাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পাওয়া যায় তামাকের বিষাক্ত গন্ধ। গতকাল নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, স্কুলটির সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে একটি গ্রুপের তামাক বাইন সেন্টার। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তামাক কিনে এখানে আনা হয়। তারপর প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তামাক প্রক্রিয়ার চুল্লি থেকে ধোঁয়া বের হয়। সেই ধোঁয়া সরাসরি ঢুকে পড়ে শ্রেণিকক্ষে। এতে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ঝুঁকিতে পড়েছে। বিষিয়ে যাচ্ছে তাদের ফুসফুস।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, নিকোটিন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। তামাক কারখানায় কাজ করা কর্মীদের মধ্যে একটি রোগ দেখা যায়- সবুজ তামাক রোগ। যে তামাক গাছগুলো শুকানো হয়নি, সেগুলো থেকে নিকোটিন শোষণ করে নেয় মানুষের ত্বক। গিলাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তামাক শ্রমিক নয়। তারা স্কুলে যায় পড়ালেখার জন্য; কিন্তু তাদের মধ্যেও সবুজ তামাক রোগের লক্ষণ- বমিভাব, মাথাব্যথা আর শ্বাসকষ্ট দেখা যাচ্ছে। মরণব্যাধির ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে বসছে তারা। শিশুদের এ শারীরিক কষ্ট এক দিকে তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে, অন্য দিকে পড়াশোনায় মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। এতে হুমকিতে পড়েছে তাদের শিক্ষাজীবন। স্কুলের ছোট ছোট শিশুর মুখগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আমরা তাদের ন্যূনতম নিরাপদ পরিবেশ দিতে পারছি না। কেবল গিলাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, এ নীরব ঘাতক পুরো এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে কিভাবে তামাক প্রক্রিয়াজাত করা হয়, সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। এর জন্য কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বৈধ কাগজপত্রও দেখাতে পারেনি বলে খবরে জানানো হয়েছে। অভিভাবকরা বারবার প্রতিবাদ করছেন। তারপরও প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে এমন বিষাক্ত কার্যক্রম দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন অনুযায়ী, জনবসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তামাকজাত কারখানা স্থাপনের সুযোগ নেই। তবু এ নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে।
খবরে জানানো হয়, তামাক প্রক্রিয়া করার ওই প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক। কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। কিন্তু এতদিন কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, সেটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের এই ‘আশ্বাস’ কেবল কালক্ষেপণ কি না, তা নিয়েও সংশয় থাকা স্বাভাবিক।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই। অবিলম্বে ওই তামাক সেন্টারটি সেখান থেকে উচ্ছেদ বা স্থানান্তর করতে হবে। যারা নিয়ম ভেঙেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। সেই শিশুদের জীবনের বিনিময়ে কোনো বাণিজ্যিক মুনাফা কখনো কাম্য হতে পারে না।
গিলাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তামাকমুক্ত ও দূষণমুক্ত পড়ালেখার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব। আমরা আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে।



