শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন দেশের সম্পদ লুটপাটের কারণে নিন্দিত হয়েছে। তখন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দ্বার অলিগার্কদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছিল। এই সুযোগে হাসিনার মদদপুষ্ট গোষ্ঠী দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা ফোকলা করে দেয়। সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংক ছাড়াও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও লুণ্ঠন করা হয়।
শেখ হাসিনার পতনের পর সে জন্য বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ধস নামে। সব ব্যাংক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললেও কিছু ব্যাংক দেউলিয়ার পর্যায়ে চলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার প্রণোদনা দিয়ে সেগুলো রক্ষার পাশাপাশি সংস্কারে প্রস্তাব আনে। যার লক্ষ্য ছিল ধসে পড়া ব্যাংক ব্যবস্থা উদ্ধারের পাশাপাশি লুটেরাদের হাত থেকে এই খাত রক্ষা করা। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশটি বর্তমান নির্বাচিত সরকার এমনভাবে পরিবর্তন করে সংসদে পাস করেছে, যাতে সহজে পুরনো লুটেরা শ্রেণীর ব্যাংকগুলো অনায়াসে দখলে নেয়ার দ্বার আবার খুলে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ হাসিনার সময়ে লুটেপুটে ফোকলা করে দেয়া দুর্বল ও আর্থিক সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও একীভূতকরণে বাংলাদেশ ব্যাংককে দেয়া বিশেষ ক্ষমতা। ত্রয়োদশ সংসদে এটি পাস হওয়ার পর দেখা গেল, এতে এমন একটি ধারা যুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যা এর আসল উদ্দেশ্য ক্ষুণ্ন করেছে। সংযুক্ত ১৮ (ক) ধারা মতে, একীভূত হওয়া বা একত্রীকরণের তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর সাবেক পরিচালক বা মালিকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া অর্থের মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করে ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পেতে পারেন। এ অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য ছিল যেসব লুটেরার জন্য ব্যাংকগুলো ভয়াবহ দুরবস্থায় পড়েছিল মালিকানায় তাদের ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়া। একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর মালিকানা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল কুখ্যাত এস আলমসহ হাসিনার কয়েকজন অলিগার্ক।
এস আলম একাই কয়েকটি ব্যাংক থেকে দুই লাখ কোটি টাকা লুটে নেন। আমানতকারীরা যখন দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে গচ্ছিত অর্থ ফিরে পেতে ব্যর্থ হন, তখন এস আলম তাদের অর্থ লুটে নিয়ে বিদেশে বিলাসী জীবন যাপন করছেন। এখন সামান্য কিছু টাকা জমা দিয়ে এস আলমের পক্ষের লোকদের এসব ব্যাংকের মালিকানা আবারো সহজে দখল করার পথ সুগম করে দেয়া হলো।
গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, অধ্যাদেশটি সংসদে পাস হওয়ার ঠিক আগের দিন উল্লিখিত ধারাটি সংযুক্ত হয়। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও কিছু জানেন না। পুরনোদের ব্যাংকের মালিকানা নেয়ার আগে আমানতকারীর টাকা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রণোদনা সহায়তা এবং অন্যান্য সব দেনা পুরোপুরি পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা রাখার পরামর্শ ছিল। এই শর্তগুলোও পাস হওয়া অধ্যাদেশ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
যে বিশৃঙ্খলা হাসিনা সৃষ্টি করে দিয়ে গেছেন এখনো তা থেকে ব্যাংক খাতের উত্তরণ ঘটেনি। বিশেষ করে পাঁচটি ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল নগদ প্রণোদনা নিয়ে এগিয়ে না এলে এতদিনে দেউলিয়া হয়ে যেত। এই অরক্ষিত অবস্থায় অধ্যাদেশটির পাসের পর ব্যাংক খাত নিয়ে মানুষের অনাস্থা নিঃসন্দেহে আরো বাড়বে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। বিপুল সমালোচনার পরও সরকার নীরব থাকার নীতি নিয়েছে। ব্যাংক আইন নিয়েও কি সরকার একই নীতি অনুসরণ করবে?



