বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির পরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ গত বৃহস্পতিবার বাতিল করেছে সরকার। একই সাথে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬ পাস করে ২০০৯ সালের আইন আবার চালু করা হয়েছে। আপত্তি সত্ত্বেও অধ্যাদেশগুলো বাতিল করায় জাতীয় সংসদ থেকে ঘোষণা দিয়ে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
আগের আইনে ফেরার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের বাছাই কমিটিতে আবার সরকারের প্রভাব বাড়বে। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কমিশন তদন্ত করার ক্ষমতা হারাবে। কিছু ক্ষেত্রে কমিশনের স্বাধীনতা কমবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা কমবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের বিধান এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় জারি করা অধ্যাদেশগুলোও বাতিল করা হয়েছে। এতে বিচার বিভাগ আবার আগের অবস্থায় ফিরছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের আর কোনো আইন থাকছে না। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সংক্রান্ত দু’টি অধ্যাদেশ (সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও এর সংশোধনী অধ্যাদেশ) বাতিল হওয়ার সাথে সাথে ওই অধ্যাদেশের অধীনে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে। অধ্যাদেশ দু’টি বাতিল করতে আনা বিল পাসের বিরোধিতা করে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারের এ উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ।
অতীতে কোনো সরকার বিচারক নিয়োগের আইন করেনি। আগে বিভিন্ন সময়ে বিচার বিভাগে রাজনীতিকীকরণের অভিযোগও ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ করে। তাতে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগে উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এ কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে।
আর অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ করা হয়। তাতে বলা হয়েছিল, অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল করায় এ নিয়ে জনপরিসরে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচার বিভাগে দলীয়করণ, এ দুই বিষয়ে বিএনপির যে রাজনৈতিক অবস্থান ছিল, তার সাথে অধ্যাদেশগুলো বাতিল করা মানানসই নয়। অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পুনর্বহাল হচ্ছে, অথচ ওই আইনের অধীনে মানবাধিকার কমিশন একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। এ ছাড়া গুম প্রতিরোধ এবং জুলাই অভ্যুত্থানের দায় নির্ধারণে কমিশনকে সুনির্দিষ্ট এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল। কমিশন নিয়োগের যে বাছাই কমিটি, তাতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিনিধিত্ব সঙ্কুচিত করা হয়েছিল। সদস্যদের যোগ্যতাও সুনির্দিষ্টভাবে বলা ছিল। অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বর্ধিত ক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা বিলুপ্ত হবে। অন্য দিকে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশটি বাতিলে আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ আছে, রাজনৈতিক বিবেচনাই বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে উঠবে।
এসব অধ্যাদেশ বাতিল ঘিরে যে বিতর্কের জন্ম হয়েছে, তা কেবল আইনি বা প্রশাসনিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মূলত চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। হঠাৎ করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করায় স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে, এতে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া থমকে যাবে না তো?



