রফতানিতে গভীর সঙ্কট

কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষা

দেশের জিডিপিতে বেশির ভাগ অবদান রাখা এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা পোশাকশিল্পকে কোনোভাবেই মুখ থুবড়ে পড়তে দেয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, পোশাক খাতের সঙ্কট মানেই পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্কট। সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই খাতের মেঘ কাটিয়ে সম্ভাবনা ফিরিয়ে আনতে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত তৈরী পোশাক খাত এখন বহুমুখী সঙ্কটের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধের দাবানল ও জ্বালানি সঙ্কট এই খাতকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে রফতানি আয় কমেছে প্রায় ৭৭ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উদ্বেগজনকভাবে কম। বছরের প্রথম ৯ মাসে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে ৫.৫১ শতাংশ, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ভালো খবর নয়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক রুটে পণ্য পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সমুদ্রপথে পণ্য পৌঁছতে পারছে না। অনেক চালান সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার বন্দরে মাসের পর মাস আটকে থাকছে। আকাশপথে রফতানি সচল থাকলেও উড়োজাহাজের ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি ও সীমিত ফ্লাইটের কারণে ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এতে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছেন।

দেশের ভেতরেও পরিস্থিতি অনুকূল নয়। ডলার সঙ্কটে কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র-এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য এবং অনিয়মিত সরবরাহ উৎপাদন ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। জরুরি ভিত্তিতে চার হাজার কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা ছাড় করার দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। সেটি এখন টিকে থাকার অপরিহার্য ‘লাইফ সাপোর্ট’।

তৈরী পোশাক খাতের এই ভয়াবহ সঙ্কট মোকাবেলায় কোনো একক সমাধান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সরকারের সমন্বিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। বিজিএমইএ যে চার হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা চেয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত সময়ে তা ছাড় করা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোর তারল্য সঙ্কট কাটাতে এই অর্থ সঞ্জীবনী হিসেবে কাজ করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে আটকে থাকা পণ্য দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছতে এবং আকাশপথে রফতানির জন্য বিশেষ কার্গো ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো যায় কি না ভাবতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিমান ভাড়ার ওপর অস্থায়ী ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে। পোশাক কারখানাগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। বিশেষ প্রয়োজনে অন্য খাতের জ্বালানি রেশনিং করে রফতানিমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও উদীয়মান বাজারগুলোতে রফতানি বাড়াতে বাণিজ্যিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া ডলার সঙ্কট কাটাতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সহজ শর্তে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা চালু রাখতে হবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে বিপাকে পড়া উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমাও বাড়ানো যেতে পারে।

দেশের জিডিপিতে বেশির ভাগ অবদান রাখা এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা পোশাকশিল্পকে কোনোভাবেই মুখ থুবড়ে পড়তে দেয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, পোশাক খাতের সঙ্কট মানেই পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্কট। সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই খাতের মেঘ কাটিয়ে সম্ভাবনা ফিরিয়ে আনতে।