সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা

লাশের গালিচায় বন্ধুত্ব হয় না

সরকারের উচিত কেবল বিবৃতি আর পতাকা বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধে ভারতকে কঠোর বার্তা দেয়া। দিল্লির সাথে সুসম্পর্ক অবশ্যই কাম্য, তবে তা কোনোভাবে বাংলাদেশীর লাশের ওপর দিয়ে নয়। সরকারকে বুঝতে হবে, দেশের মানুষ আধিপত্যবাদ মেনে নেবে না। ভারতের প্রতি সরকারের নীতি হতে হবে সম-মর্যাদার। সীমান্ত হত্যার প্রতিটি ঘটনা আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলতে হবে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে একে ‘শর্তহীন অগ্রাধিকার’ হিসেবে গণ্য করতে হবে। না হয় এই ‘সুসম্পর্ক’ কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

সীমান্তে আবারো বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী নিহত! মঙ্গলবার দিনগত রাত ৩টায় লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে আলী হোসেন নিহত হয়েছেন। এর দু’দিন আগে একই এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মিজানুর রহমান। ওই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছিল বিএসএফ; কিন্তু এর পরদিনই আরেক হত্যা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান যখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে দিল্লিতে আছেন, সেখানে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে নৈশভোজে অংশ নিচ্ছেন, তখনই সীমান্তে বাংলাদেশীর রক্ত ঝরছে।

বলা হয়ে থাকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সাথে বাংলাদেশের একধরনের কূটনৈতিক শীতলতা ছিল। এর মূলে ছিল ভারতের একপক্ষীয় আধিপত্যবাদী নীতি। বাংলাদেশের মানুষ এখন সচেতন এবং আধিপত্যবাদবিরোধী। ওই সময় স্বর্ণা দাসের মতো কিশোরী যখন বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারায়, তখন এ দেশের মানুষ ও বিজিবি স্বতঃস্ফূর্ত ও সাহসী ভূমিকা নিয়েছিলেন। সরকারের কূটনৈতিক দৃঢ়তা ছিল। প্রতিটি ঘটনার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল, ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করা হয়েছিল। সীমান্ত এলাকায় স্থানীয়দের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ, বিজিবির সক্রিয় ভূমিকায় একধরনের সতর্কতা তৈরি হয়েছিল। প্রতিটি ঘটনার আগে অন্তত ভাবতে বাধ্য হয়েছিল বিএসএফ। এটিই ছিল একটি জাতির আধিপত্যবাদবিরোধী সম্মিলিত অবস্থান।

২০২৬ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। নবগঠিত সরকার ভারতের সাথে ‘বাস্তবমুখী’ ও ‘সুসম্পর্ক’ গড়ার কথা বলছে। কূটনৈতিক তৎপরতা, দিল্লি সফর, অর্থনৈতিক সহযোগিতাÑ সব ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ভারত থেকে ডিজেল আমদানি, শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আলাপ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু দু’দিনের ব্যবধানে পাটগ্রাম সীমান্তে মিজানুর আহত হওয়া এবং আলী হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনা কী প্রমাণ করে? দুঃখ প্রকাশের পরদিন যখন আবার গুলি চলে, তখন বুঝতে হবেÑ সেই দুঃখ প্রকাশ ছিল নিছক লোক দেখানো।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যখন বাংলাদেশ নিজের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে অনড় ছিল, তখন ভারত কিছুটা পিছু হটেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার যদি কেবল ভারতকে সুবিধা দিয়ে ‘উইন-উইন’ অবস্থা খুঁজতে চায় এবং দেশের নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তবে সেই সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আন্তর্জাতিক আইনে সীমান্ত হত্যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এমনকি কেউ যদি সীমান্ত অতিক্রম করে অবৈধ প্রবেশ বা চোরাচালানের চেষ্টাও করে, তাকে গ্রেফতার করে প্রচলিত আইনে বিচারের বিধান আছে। সরাসরি গুলি চালিয়ে হত্যা করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত কেবল বিবৃতি আর পতাকা বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধে ভারতকে কঠোর বার্তা দেয়া। দিল্লির সাথে সুসম্পর্ক অবশ্যই কাম্য, তবে তা কোনোভাবে বাংলাদেশীর লাশের ওপর দিয়ে নয়। সরকারকে বুঝতে হবে, দেশের মানুষ আধিপত্যবাদ মেনে নেবে না। ভারতের প্রতি সরকারের নীতি হতে হবে সম-মর্যাদার। সীমান্ত হত্যার প্রতিটি ঘটনা আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলতে হবে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে একে ‘শর্তহীন অগ্রাধিকার’ হিসেবে গণ্য করতে হবে। না হয় এই ‘সুসম্পর্ক’ কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চায়; কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে সম-মর্যাদার ভিত্তিতে। সীমান্তে রক্ত ঝরিয়ে কোনো সম্পর্ক টেকসই হয় না। লাশের গালিচায় বন্ধুত্ব হয় না।