বাংলাদেশে অনেক স্থানে নিরাপদ খাবার পানির সঙ্কট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকা এবং দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলে এই সঙ্কট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, নদ-নদীর নাব্য হ্রাস এবং লবণাক্ততার বিস্তারে বিপুল মানুষ প্রতিদিন নিরাপদ খাবার পানির জন্য সংগ্রাম করছেন। এটি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি ও মানবাধিকারের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় সঙ্কট।
গণমাধ্যমের খবর, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক গ্রামে এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম পানি। এক সময় যে পুকুরের পানি মানুষ ব্যবহার করত দৈনন্দিন কাজে, সেই পুকুর আজ পরিত্যক্ত। বাড়ির উঠানের নলকূপে পানি ওঠে না। যে গভীর নলকূপ দিয়ে বিঘার পর বিঘা জমিতে সেচ দেয়া হতো, সেই নলকূপে কখনো পানি পাওয়া যায়, কখনো যায় না। এতে অনেক এলাকায় খাওয়ার পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, নির্বিচার ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় মাটির নিচের পানিধারক স্তর বা ‘অ্যাকুইফার’ মারা যাচ্ছে। ফলে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলেও মাটির নিচে পানি জমছে না। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোসহ বিকল্প উদ্যোগের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত বিকল্প পানির উৎসের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় পানির জন্য ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে।
অন্য দিকে উপকূলীয় অঞ্চলে সমস্যা ভিন্ন হলেও সমান ভয়াবহ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ে নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটসহ বহু এলাকায় নিরাপদ খাবার পানি দুর্লভ হয়ে পড়েছে। মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত বা দূষিত পানি ব্যবহার করছেন; যার ফলে ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, চর্মরোগসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে।
পানি সঙ্কটের মতো এত বড় সঙ্কট মোকাবেলায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বর্তমানেও দৃশ্যমান নয়। বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে সত্য, তবে সেগুলোর অনেকই টেকসই নয়। এমনকি স্থানীয় বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণও নয়। কোথাও গভীর নলকূপ স্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু কিছু দিন পর সেগুলো অচল হয়ে যাচ্ছে। কোথাও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুকুর, খাল ও জলাধার পুনর্খননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাড়াতে হবে। কম পানি প্রয়োজন হয় এমন ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহ দিতে হবে। উপকূলে বড় পরিসরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প, আধুনিক পানি শোধনাগার এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা- নিরাপদ পানি মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই কোনোভাবে এ সঙ্কট অবহেলা করার সুযোগ নেই। কোনো ধরনের কালক্ষেপণ না করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে আগামী দিনগুলোতে পানির এ সঙ্কট গভীর মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। তেমন দিন যাতে না আসে, সে জন্য আমাদের দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে টেকসই সমাধানের পথে এগোতে হবে।



