তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বহু দিন ধরে দেশে আলোচনা হচ্ছে। এ প্রকল্পে বেইজিংয়ের সহযোগিতা নেয়ার কথা বহুল আলোচিত একটি বিষয়। বাংলাদেশের জন্য কার্যকর একটি প্রকল্প হলেও প্রতিবেশী দেশের বৈরী মনোভাব বিবেচনায় চীনা সহযোগিতা নিতে ধীরগতির নীতি অবলম্বন করা হয়। নতুন সরকার চীনের সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) বেইজিংয়ের সম্পৃক্ততা ও সহায়তা চেয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গত বুধবার পাঠানো এক যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র আমন্ত্রণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৫-৭ মে পর্যন্ত চীন সফর করেন। এটি ছিল তার প্রথম বেইজিং সফর। সফরকালে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে গভীর আলোচনা করে এবং বিস্তৃত ঐকমত্যে পৌঁছায়। পাশাপাশি একে-অপরের মৌলিক স্বার্থে সমর্থন এবং প্রধান উদ্বেগগুলো মোকাবেলায় দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ তিস্তা নদী আজ পানি আগ্রাসনে জর্জরিত। এক দিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সঙ্কট, অন্য দিকে বর্ষায় ভয়াবহ ভাঙন ও বন্যা। এই দুই বিপর্যয়ের মাঝখানে পড়ে তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবন-জীবিকা ক্রমে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ, নৌযোগাযোগ এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক অর্থনীতি তিস্তার অস্থিতিশীলতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে টিআরসিএমআরপি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সম্পৃক্ততা ও সহায়তা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য নিঃসন্দেহ আশাপ্রদ।
নদী ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। আধুনিক প্রযুক্তি, অর্থায়ন সক্ষমতা এবং দ্রুত বাস্তবায়ন দক্ষতা কাজে লাগিয়ে চীন সহজে তিস্তা নদীর পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনায় কার্যকর অগ্রগতি আনতে পারবে।
টিআরসিএমআরপি বাস্তবায়ন হলে তিস্তা নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা, তীররক্ষা, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা যাবে। এতে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বাড়বে; এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়। সেই সাথে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে, যাতে লাখো মানুষের জীবনমান সহজে উন্নত হবে। এ ছাড়া নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ আসবে।
তবে মনে রাখা আবশ্যক, এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বচ্ছতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। প্রকল্প যেন কোনোভাবে পরিবেশের ক্ষতি না করে। জনগণের বাস্তব চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। উন্নয়ন অবশ্যই টেকসই ও জনকল্যাণমুখী হওয়া বাঞ্ছনীয়। একই সাথে তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী হওয়ায় এর সাথে আঞ্চলিক কূটনীতির গভীর সংযোগ রয়েছে। তাই চীনের সহযোগিতা নিতে বাংলাদেশকে ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী কূটনৈতিক অবস্থান বজায়ে রাখতে হবে।
সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে এ প্রকল্প দেশের উত্তর জনপদের উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সহায়ক হবে। সব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, তিস্তা যেন আবার জীবন ও সমৃদ্ধির উৎসে পরিণত হয়।



