হামে মৃত্যু এখনো উদ্বেগজনক

চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল

হামে আক্রান্তরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পায়নি। আমাদের স্বাস্থ্য খাত সময়মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। করোনাকালেও এমনটি দেখা গেছে। যদিও হামে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আইসিইউ সেবা বাড়িয়ে দেয়ার পদক্ষেপের কথা বলছে। সেই সাথে সরকার ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে। ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের এই টিকা দেয়া চলবে এ মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত। হামের চিকিৎসায় এবং এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো গাফিলতি গ্রহণযোগ্য হবে না।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে প্রথম হাম শনাক্ত হয়। ২৪ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগের প্রাদুর্ভাববিষয়ক এক খবরে বাংলাদেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার কথা জানায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামে আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।

হাম খুব ছোঁয়াচে। হাঁচি, কাশির মাধ্যমে মুহূর্তে হামের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। অল্প সময়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। হাম মূলত ‘মিজলস’ নামের এক ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত রোগ। উচ্চমাত্রার জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, রক্তবর্ণের চোখ এবং জ্বরের চার দিনের মাথায় মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে র‌্যাশ নিয়ে হাম আবির্ভূত হয়। হামের জটিলতা হিসেবে পরবর্তী সময়ে প্রায়ই নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া হতে পারে।

দেশে হামে শিশুমৃত্যু এখনো উদ্বেগজনক। হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে গত সোমবার এক দিনে দেশে সর্বোচ্চ ১৭ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। সংস্থাটির তথ্যমতে, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত্যু ২৫৯ জনের। আর হামে মৃত্যু ৫২ জনের। সব মিলিয়ে ৩১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন, প্রাদুর্ভাবের সময় উপসর্গ নিয়ে যেকোনো রোগীর মৃত্যুকে হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র বলছে, এ বছর ৪১ হাজার ৭৯৩ রোগী হামের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছে। এদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৮ হাজার ৮৪২ জন। কিন্তু হাম শনাক্ত হয়েছে পাঁচ হাজার ৪৬৭ জনের। বাস্তবে হামে আক্রান্ত হয়েছে আরো অনেক বেশি। কারণ, সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও বেসরকারি ক্লিনিক ও চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে অনেকে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। এদের হিসাব সঠিকভাবে আসছে না। সরকারি হিসাবের চেয়ে হামে আক্রান্তের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বেশি।

হামে মৃত্যু কমানো যেত কি-না, স্বাস্থ্য বিভাগ মৃত্যু ঠেকাতে সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচিতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের দু’বার ‘এমআর’ (মিজলস রুবেলা) টিকা দেয়া হয়। একবার ৯ মাস বয়সে, আর দ্বিতীয়টি ১৫ মাস বয়সে। ২০২৫ সালের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৮৮ শতাংশ দুই ডোজ ‘এমআর’ টিকা নিয়েছে। তবে দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে- এখনো নানা জায়গায় অনেক শিশু এই ‘এমআর’ টিকা পায়নি বা দিতে টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়নি; আবার কেউ একটি নিয়েছে।

হামে আক্রান্তরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পায়নি। আমাদের স্বাস্থ্য খাত সময়মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। করোনাকালেও এমনটি দেখা গেছে। যদিও হামে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আইসিইউ সেবা বাড়িয়ে দেয়ার পদক্ষেপের কথা বলছে। সেই সাথে সরকার ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে। ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের এই টিকা দেয়া চলবে এ মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত। হামের চিকিৎসায় এবং এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো গাফিলতি গ্রহণযোগ্য হবে না।