সমাজের দরিদ্র মানুষ জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন। সমাজে এমন অনেকে আছেন, যারা সন্তান-সন্ততি লালন-পালনের পর নানা কারণে আপনজনের কাছে ‘বোঝা’ হয়ে পড়েন। তখন ওই সব অসহায় বয়স্ককে দেখার কেউ থাকে না। এমন মানুষের জন্য সরকারের কিছু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে। যার উদ্দেশ্য আর্থিক সহযোগিতায় অসহায়ের জীবন সহজ করা। কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে লোক বাছাইয়ে কাদের নির্বাচন করা হচ্ছে? প্রকৃত হকদার কি এগুলো পাচ্ছেন?
নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার আংগারিয়া গ্রামের আনোয়ারা বেগম নামে এক অশীতিপর বৃদ্ধার অসহায় জীবনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। চার দশক আগে স্বামী মারা গেলে জীবন সংগ্রামমুখর হয়ে ওঠে তার। দিনমজুর স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য বসতভিটা আর নিজের শ্রমে পাঁচ সন্তান বড় করে তুলেন। কিন্তু দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারেনি সন্তানরা। আজও দিন আনে দিন খায়, রিকশা চালানো কিংবা দিনমজুরির আয়ে নিজেদের সংসার চালাতে হিমশিম খায় তারা। ফলে বার্ধক্যে মায়ের দায়িত্ব নেয়া হয়ে উঠেছে কষ্টসাধ্য। আনোয়ারার জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে আট মাস আগে, এক কালবৈশাখী ঝড়ে। যখন তার একমাত্র ঝুপড়ি ঘরটি ভেঙে পড়ে। সেই থেকে কার্যত গৃহহীন। কখনো মেয়ের বাড়ির এক কোণে, কখনো অন্যের বারান্দায় রাত কাটছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার জন্য ঘর তৈরির আশ্বাস দেয়া হয়েছে। কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সহায়তা করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, দেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক, বিধবা ভাতার মতো রাষ্ট্রীয় সুবিধাগুলো আনোয়ারা বেগমের মতো অসহায়রা কবে পাবেন? এসব সুবিধা কবে তাদের জীবনে স্বস্তি নিয়ে আসবে? এসব ভাতা বণ্টনে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত; তারা কি আনোয়ারা বেগমদের দিকে দৃষ্টি ফেরাবেন?
এটি শুধু যে ঝলকাঠির একজন আনোয়ারা বেগমের ঘটনা তা কিন্তু নয়। সারা দেশে এমন অনেক আনোয়ারা বেগম খুঁজে পাওয়া যাবে, যাদের থাকার ঘর নেই, কোনো উপার্জন নেই। এসব অসহায় মানুষ সমাজে অনেকটাই অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকেন! এগুলো নিয়ে প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন হয়।
আমরা বিস্ময়ের সাথে দেখেছি, কিভাবে অসহায়দের বাড়িঘর দেয়ার নামে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অর্থ লুটপাট ও অনিয়ম হয়েছে। এই লুটপাট-অনিয়মের কারণে প্রকৃত অসহায়রা ঘর পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সেই সাথে দেখা গেছে, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পেতে অতীতে অর্থ লেনদেনও হয়েছে। অনৈতিকভাবে সুবিধা নিতে গিয়ে সমাজে যাদের এসব সরকারি সুবিধা পাওয়ার কথা, তারা বঞ্চিতই থেকে গেছেন। অসহায়দের জন্য সরকারের যেসব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে, এতদিন কারা পেয়েছেন সেগুলো যাচাই করা দরকার। প্রকৃত হকদার ছাড়া অন্য কেউ পেয়ে থাকলে সেগুলো বাদ দিতে হবে। নতুন করে সুবিধাভোগীর তথ্য হালনাগাদ করতে হবে।
সমাজের অসহায় মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ কিংবা আর্থিক অনটন থেকে মুক্ত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; সমাজের বিত্তবানদেরও দায় রয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আনোয়ারা বেগমের মতো অসহায়দের কষ্ট লাঘব হোক এটিই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সবার প্রত্যাশা।



