রিজার্ভ চুরি মামলার খসড়া অভিযোগপত্র

জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

রিজার্ভ চুরির এক দশক পর দেশের মানুষ আর নতুন তারিখ বা ব্যাখ্যা শুনতে চান না। দেখতে চান, দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিরাপদ হচ্ছে কি না। রাষ্ট্র তার আর্থিক সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সংঘটিত এই অপরাধের যথাযথ বিচার করতে পারছে কি না?

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। অজ্ঞাত হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট পদ্ধতিতে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর মতিঝিল থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরু থেকে সিআইডি এর তদন্তভার নেয়।

নয়া দিগন্তের খবর বলছে, খসড়া অভিযোগপত্রে বাংলাদেশের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশের ১০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আছেন। তালিকায় ৩৬ বিদেশী নাগরিক এবং ১৮টি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের নাম আছে। দীর্ঘদিন তদন্ত ঝুলে থাকার পর, গত বছরের ১১ মার্চ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছয় সদস্যের একটি বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। কমিটির নিবিড় তত্ত্বাবধানে তদন্তপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। গত পয়লা এপ্রিল খসড়া চার্জশিটটি প্রস্তুত করে আইনি মতামতের জন্য পাঠানো হয়।

প্রকৃতপক্ষে চুরির ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকে জানত; কিন্তু অর্থের গন্তব্য ও পাচারের পথ সম্পর্কে জনসমক্ষে প্রথম অনুসন্ধানী তথ্য প্রকাশ করে ফিলিপাইনি দৈনিক ইনকোয়ারার। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে পত্রিকাটি প্রথম বিস্তারিতভাবে দেখায়, চুরি হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের ব্যাংকিং ও ক্যাসিনো ব্যবস্থার মাধ্যমে পাচার হয়েছে। পরে ফিলিপাইনের সিনেটে শুনানি শুরু হলে এবং দেশটির অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং কাউন্সিল-এএমএলসি তদন্তে নামলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা দেশের ইতিহাসে শুধু একটি আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়; বরং রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তা, সুশাসন ও জবাবদিহির সক্ষমতার একটি বড় ব্যর্থতা। তবে ঘটনার এক দশক পর সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ ৬৪ জনের বিরুদ্ধে খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুতের খবর দেশবাসীর মধ্যে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে।

মামলাটির বড় দুর্বলতা ছিল দীর্ঘসূত্রতা এবং বারবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন। সেই সাথে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৯০ বারের বেশি পেছানো হয়। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছিল, এত বড় আর্থিক অপরাধের বিচার কি আদৌ হবে? নাকি সময়ের আবর্তে ধামাচাপা পড়বে? খসড়া অভিযোগপত্র প্রণয়ন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে খসড়া অভিযোগই শেষ কথা নয়; এটি আদালতে দাখিল, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং রায়- এই দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়াই আসল কথা।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ব্যক্তিগত দায়ের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রশ্নও উঠেছে। কিভাবে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরাপত্তাব্যবস্থায় এমন দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল? কেন সময়মতো ঝুঁকি শনাক্ত করা যায়নি? কারা দায়িত্বে অবহেলা করেছিলেন? বিচারিক প্রক্রিয়ায় এসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। শুধু কয়েকজনকে শাস্তি দিলেই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না; প্রয়োজন ব্যবস্থাপনায় সংস্কার।

রিজার্ভ চুরির এক দশক পর দেশের মানুষ আর নতুন তারিখ বা ব্যাখ্যা শুনতে চান না। দেখতে চান, দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিরাপদ হচ্ছে কি না। রাষ্ট্র তার আর্থিক সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সংঘটিত এই অপরাধের যথাযথ বিচার করতে পারছে কি না?