শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা বজায় না থাকলে দেশের কাক্সিক্ষত অগ্রগতি সম্ভব নয়। বর্তমানে শিক্ষা প্রশাসনে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদায়নে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যোগ্য ও সিনিয়রদের ডিঙিয়ে জুনিয়রদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নে শিক্ষা খাতে কর্মকর্তা-শিক্ষকদের মধ্যে একধরনের চাপা ক্ষোভ আর হতাশা বিরাজ করছে।
নয়া দিগন্তের খবর বলছে, সিনিয়রদের ডিঙিয়ে জিুনিয়রদের শীর্ষ পদে বসানোর প্রক্রিয়াটি মূলত শুরু হয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক পদে পদায়নের পর থেকে। খোদ মাউশিতে কর্মরত জ্যেষ্ঠ অন্তত অর্ধডজন কর্মকর্তাকে গত তিন মাসে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা বা মেধার চেয়ে ব্যক্তিবিশেষের অনুগত বা নজরে আসাই এখন পদায়নের বড় যোগ্যতা হয়ে উঠেছে।
শিক্ষা প্রশাসন একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড। এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা অনেকাংশে নির্ভর করে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং জ্যেষ্ঠতার যথাযথ মূল্যায়নে; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে জুনিয়রদের পদায়নের প্রবণতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক নীতিমালার পরিপন্থী নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে।
জ্যেষ্ঠতা কোনো ব্যক্তির কর্মজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবদানের স্বীকৃতি। একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে ও প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তরে কাজ করে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জ্যেষ্ঠদের পাশ কাটিয়ে কনিষ্ঠদের পদায়ন করা হলে অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যবহার সম্ভব হয় না।
এ ধরনের পদায়নে কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে যায়। যখন একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা দেখেন, তার চেয়ে কম অভিজ্ঞ ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাচ্ছেন, তখন তার মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ দেখা দেয়। এতে কর্মস্পৃহা কমে যায়। এ ছাড়া প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো কর্মপরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের আরেকটি বড় ক্ষতিÑ প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অবনতি। অনেক ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মকর্তা তার জ্যেষ্ঠ সহকর্মীর ওপর প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেন। এতে পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপড়েন দেখা দেয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জটিলতায় পড়তে হয়। ফলে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। সেই সাথে এমন পদায়ন স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব বা অস্বচ্ছতার অভিযোগকে উসকে দেয়। যদি পদোন্নতি ও পদায়নে সুস্পষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করা হয়, তাহলে কর্মকর্তাদের মধ্যে ধারণা জন্মায়, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে অন্য কোনো প্রভাব বেশি কার্যকর। এটি একটি সুস্থ প্রশাসনিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, নীতিনির্ধারণ, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের মতো জটিল দায়িত্ব পালনে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্রশাসনিক বিবেচনায় বা অন্য কোনো কারণে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আমরা মনে করি, শিক্ষা প্রশাসনে পদায়ন ও পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হলে তার যৌক্তিক কারণ প্রকাশ করা আবশ্যক। অন্যথায় প্রশাসনে অসন্তোষ, বৈষম্য এবং অকার্যকারিতা বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। তাই একটি শক্তিশালী ও কার্যকর শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ পদায়ননীতি অনুসরণের বিকল্প নেই।



