শহরাঞ্চলের ঠিকানাহীন ছিন্নমূল মানুষ

পরিকল্পিত পুনর্বাসনের অভাব

আশ্রয়হীন জীবন শুধু মাথার উপর ছাদের অভাব নয়, এটি নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্কটও বটে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ; তারা সহিংসতা ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে। এই সমস্যার সমাধানে আমাদের উদ্যোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। কিছু সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ও বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত নীতির অভাবে সমস্যাটি থেকে যাচ্ছে অবহেলিত। এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নগর পরিকল্পনায় নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর তথ্যমতে, সারা দেশে ২২ হাজার ১১৯ জন ছিন্নমূল বা গৃহহীন মানুষ রয়েছে। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার তথ্যমতে, শুধু ঢাকা শহরে প্রায় ৫০ হাজার ছিন্নমূল মানুষের বসবাস। অন্য দিকে বিভিন্ন সংস্থার মতে, সারা দেশে শুধু পথশিশুর সংখ্যা ১০-১৫ লাখ। বোঝা যাচ্ছে, ছিন্নমূল মানুষের সঠিক সংখ্যা আমাদের জানা নেই। সেটি না জানা থাকলেও সংখ্যাটি যে বেশ বড়, তাতে সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- ঝড়-বন্যা, নদীভাঙনে প্রতি বছর বিপুল মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। আশ্রয়হীন মানুষ জীবিকার তাগিদে শহরে আসে। নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে রাজধানীর ছিন্নমূল মানুষের অমানবিক জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে।

এদের বাস মূলত শহরাঞ্চলের জনসমাগমপূর্ণ এলাকায়। শহরের আলো ঝলমলে জীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতা, আশ্রয়হীন মানুষের সংগ্রাম। প্রতিদিন আমরা যে নগরজীবনের ব্যস্ততা দেখি, তার প্রান্তে ফুটপাথ, রেলস্টেশন, ফ্লাইওভারের নিচে কিংবা খোলা জায়গায় তারা রাত কাটায়। তারা আমাদের সমাজের অংশ; কিন্তু তাদের অস্তিত্ব যেন অদৃশ্য।

বাস্তুহারাদের পাশাপাশি নানা কারণে মানুষ গ্রাম থেকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য একটি কারণ নদীভাঙন। নদীভাঙনে দেশে প্রতি বছর ৬৮ হাজারের মতো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। নানা কারণে বসতভিটা হারানো পরিবার, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী, কিংবা দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়া অসহায় মানুষ এসে উঠছে শহরে। এরা যেমন নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারে না, তেমনি রাষ্ট্র এবং সরকারও তাদের দায় নেয় না।

আশ্রয়হীন জীবন শুধু মাথার উপর ছাদের অভাব নয়, এটি নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্কটও বটে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ; তারা সহিংসতা ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে। এই সমস্যার সমাধানে আমাদের উদ্যোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। কিছু সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ও বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত নীতির অভাবে সমস্যাটি থেকে যাচ্ছে অবহেলিত। এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নগর পরিকল্পনায় নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি আশ্রয়হীন মানুষের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার। শুধু দান-খয়রাত নয়, তাদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা সমাজের মূলধারায় ফিরতে পারে।

এটিও লক্ষণীয় যে, কিছু মানুষ পুনর্বাসিত হলেও তারা আবার ভাসমান জীবনে ফিরে আসে। কেন তারা পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে বারবার রাস্তায় ফিরে আসে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সঙ্কট। দীর্ঘ দিন ফুটপাথে বসবাস করে তারা একধরনের নিয়মহীন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে; ফলে আশ্রয়কেন্দ্রের শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশ অনেকের কাছে বন্দিত্ব মনে হয়। এর সাথে যুক্ত হয় তীব্র মানসিক ট্রমা, একাকীত্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তি। এ প্রবণতা রোধে পুনর্বাসনকে কেবল ‘আশ্রয়’ হিসেবে না দেখে ‘পুনর্গঠন প্রক্রিয়া’ হিসেবে ভাবতে হবে।