দেশে প্রথমবারের মতো ভূগর্ভের প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার (১৮ হাজার ৩৭২ ফুট) গভীরে গ্যাসকূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। একে বলা হয়Ñ ডিপ ড্রিলিং। প্রায় ২০ বছর ধরে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে মনোযোগ দেয়া হয়নি। নতুন করে সরকার খননকাজের সূচনা করল। সিলেটের তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের দু’টি কূপে ডিপ ড্রিলিং করা হলে দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের কাজ কার্যত থমকে ছিল প্রায় দুই দশক ধরে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সারা দেশে ১০০টি কূপ খননের ঘোষণা দেয়া হয়। তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানেও নেয়া হয়নি কার্যকর উদ্যোগ। ফলে আমদানি-নির্ভরতা তীব্র হয়। দেশীয় অনুসন্ধান বন্ধ রেখে এলএনজি আমদানির পথ বেছে নেয়া হয়, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি করে। মূলত ব্যক্তি ও দলীয় সুবিধাভোগীদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যেই আওয়ামী সরকার নগদ অর্থে এলএনজি আমদানির পথ বেছে নেয়। দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ তাদের বিবেচনায় ছিল না। ফলে গত দুই দশকে গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি পঙ্গু হয়েছে। গৃহস্থালি ব্যবহারকারীরা বঞ্চিত হয়েছেন। গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদনে অচলাবস্থা চলছে। শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা কমেছে এবং ক্রমবর্ধমান এলএনজি ব্যয়ের চাপে দেশের অর্থনীতির ভারসাম্য টালমাটাল হয়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। বাস্তবে আরো বেশি। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। ভবিষ্যতে এই সঙ্কট আরো তীব্র হতে পারে। সরকার বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করছে। অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে এই মুহূর্তে জ্বালানির সরবরাহ অনেকটাই অনিশ্চিত। খুব শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনাও দৃশ্যমান নয়। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংগ্রহের বিকল্প উৎস যেমন খুঁজে নিতে হবে, তেমনি অভ্যন্তরীণ উৎসও আবিষ্কার করতে হবে। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ এর মধ্যে পড়ে।
খাদ্যনিরাপত্তার চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা মোটেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। খাবার মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে; কিন্তু কেবল বেঁচে থাকা জাতির জন্য কখনোই যথেষ্ট নয়। জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য চাই শিল্প। শিল্প চালু রাখতে চাই জ্বালানি। মূলত জ্বালানিই দেয় গতি।
ধারণা করা হয়, আগামী বছর পাঁচেকের মধ্যে দেশে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৬৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে শুধু আমদানির মাধ্যমে সে চাহিদা পূরণ অসম্ভব হতে পারে। তাই গ্যাসক্ষেত্রে ডিপ ড্রিলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাপকভিত্তিক অনুসন্ধান শুরু করা জরুরি। দেশে গ্যাসের মজুদ একেবারেই সীমিত। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু স্থলভাগে নয়, সমুদ্রে অনুসন্ধানের কাজও শুরু করা দরকার। এ জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) সক্ষমতা ও শক্তি বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে বিদেশী কোম্পানির সহায়তা নিতে হবে।



