ইরান যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত

শান্তি চুক্তির আশায় সবাই

ইরানে হামলা ছিল অন্যায় আগ্রাসন। এর ফলও আমেরিকা হাতেনাতে পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বে দেশটি নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এর মাধ্যমে খোয়াতে বসেছে। এ থেকে বিশ্বশক্তিগুলো যদি শিক্ষা নেয় তাতেই সবার মঙ্গল।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অক্ষের ইরান আক্রমণ শুধু বিবদমান পক্ষগুলো নয়, পুরো বিশ্বকে বিপর্যয়ে ফেলেছে। পেন্টাগনের হিসাবে দেশটি এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ২৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে। নিঃসন্দেহে যুদ্ধে আমেরিকার ব্যয় এর চেয়েও অনেক বেশি। অন্য দিকে বিশ্বব্যাপী বিপুল মার্কিন সম্পদহানি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও কৌশলগত সম্পদ তছনছ হয়ে গেছে। ইরানের অর্থনীতিও ধসে পড়ার উপক্রম। এর বৈশ্বিক প্রভাব আরো গভীর ও বিস্তৃত। এই যুদ্ধের অংশ না হয়েও বিশ্ববাসী বেকায়দায় আছে। এ অবস্থায় সব পক্ষ অধীর অপেক্ষায় আছেÑ যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে যাতে একটি টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়।

ইরানে হামলা চালানোর কোনো নৈতিক ভিত্তি ছিল না। ইসরাইলের উন্মাদনা ও উসকানিতে যুক্তরাষ্ট্র এতে জড়িয়েছে। দেশ দু’টি মনে করেছিল, ঝটিকা যুদ্ধে সহজে ইরানকে পরাস্ত করা যাবে। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ফাঁদে আটকা পড়েছে। বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হলেও উন্নত মনোবল ও ধৈর্য নিয়ে ইরান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের কোনো ফ্রন্টে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অক্ষ জয় পায়নি। হরমুজে অবরোধ দিয়েও সফল হতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। প্রজেক্ট ফ্রিডম নামে চালানো অবরোধ ঘোষণা দিয়ে প্রত্যাহার করতে হয়েছে। এ দিকে দিন যত যাচ্ছে, বিশ্ব জনমত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। জ্বালানি সঙ্কট থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুরবস্থা সারাবিশ্বে কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। নিরাপত্তা বিধানের বদলে খোদ আমেরিকা এখন দেশগুলোর নিরাপত্তা সঙ্কটের কারণ হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের ক্ষোভ বাড়ছে। এ অবস্থায় যুদ্ধ থেকে ত্বরিত সরে আসার তাগিদ বাড়ছে। কিন্তু বাদ সেধেছে ‘জয় দেখানোর’ লৌকিকতা। যে কারণে ট্রাম্প ক্ষণে ক্ষণে সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছেন। এতে তার অস্থির মানসিকতাও প্রকাশ পাচ্ছে। ইরান যেকোনো মূল্যে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে। যুদ্ধবিরতির সুযোগে চীন-রাশিয়াসহ শক্তিধর কৌশলগত মিত্রদের সাথে ইরান কথা বলেছে। নিজেদের পক্ষে সমর্থন আদায়ে তেহরান সফল হয়েছে। সমঝোতা আলোচনায় ইরান ইতিহাসের সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হওয়ার পর বেশ কয়েক দফায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। পাকিস্তানের মাধ্যমে সর্বশেষ একটি সমঝোতা প্রস্তাব এখন ইরানের টেবিলে। বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে, ইরানের মনোভাব কী তার প্রতি।

এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে তৃতীয় মাসে গড়িয়েছে। বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ী নেতা, ভোক্তা, রাজনীতিবিদ, জাহাজ কোম্পানি ও বীমা কোম্পানিÑ সবাই তাকিয়ে আছে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির আশায়। যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি দেবে ইরানকে; যাতে যুদ্ধ পরিস্থিতির স্থায়ী প্রশমন হয়। আগের মতো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঝুঁকি ইরান নিতে চায় না। সে জন্য চীন-রাশিয়াসহ জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের গ্যারান্টি চাচ্ছে। আশা করা যায়, ইরানের এ দাবি মেনে নেবে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানে হামলা ছিল অন্যায় আগ্রাসন। এর ফলও আমেরিকা হাতেনাতে পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বে দেশটি নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এর মাধ্যমে খোয়াতে বসেছে। এ থেকে বিশ্বশক্তিগুলো যদি শিক্ষা নেয় তাতেই সবার মঙ্গল।